ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লবের ডাক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৫:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

অর্থনীতি কেবল সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের হিসেব-নিকেশ নয়; বরং এর গভীরে নিহিত রয়েছে মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বৈষম্য শিকড় গেড়ে বসে এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তখন অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস নিছক নীতিগত প্রয়োজনীয়তা থেকে উন্নীত হয় নৈতিক অপরিহার্যতায়।

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতে প্রসার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। তবে এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর বৈষম্যের এক আখ্যান। জিনি সহগের ক্রমবর্ধমান মান, শীর্ষ দশমিকের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার ক্রমাগত হ্রাস—এই সূচকগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল কাদের জন্য মূলত কাজ করছে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি আজ চরম চাপের মুখে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির গতি স্থবির। ব্যাংক খাতের লাগামহীন লুটপাট, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট করপোরেট দুর্বৃত্তায়ন এক বিকৃত অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

বাজার অর্থনীতির নামে এক ধরনের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা বন্টন হয় নৈকট্য ও আনুগত্যের ভিত্তিতে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পরও যখন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন সৎ উদ্যোক্তারা হতাশ হন এবং অর্থনীতিতে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লব মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক সুশাসনের আমূল সংস্কার দাবি করে। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। ব্যাংক ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুনঃতফসিলের নামে দুর্নীতির অবসান জরুরি। সুইস ব্যাংকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং সম্পদের অবৈধ উৎস অনুসন্ধানের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

প্রগতিশীল করব্যবস্থার প্রবর্তন আরেকটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে একটি ন্যায্য কর কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। সম্পদ কর প্রবর্তন, ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং পুনর্বণ্টনমূলক নীতি বাস্তবায়নে সক্ষম করবে। বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, যা প্রমাণ করে যে সম্পদশালীরা তাদের ন্যায্য অবদান রাখছেন না। একটি ন্যায্য কর ব্যবস্থা ছাড়া কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা অসম্ভব।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি কল্পনারও অতীত। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং এর আওতা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সহায়তা করতে হবে। বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আয়ের বণ্টন হবে বিকেন্দ্রীভূত। যেকোনো অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার ওপর। যখন বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে অর্থ থাকে, তখনই অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি হয়, বাজার সম্প্রসারিত হয় এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়।

অর্থনৈতিক বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের দিকে ঝুঁকে পড়া। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, কৃষিতে আধুনিক কিন্তু টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শহরায়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত সচেতনতা—এসবই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির ভিত্তি।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। যারা পরিবেশদূষণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রাখে, তারাই এর সবচেয়ে বড় শিকার। উপকূলীয় এলাকার জনগণ, কৃষক সমাজ—এরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতিতে সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল শহুরে উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং গ্রামীণ এলাকা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও যেন এর সুফল পায়, সেজন্য ব্যাপক অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রয়োজন।

তবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের যেকোনো প্রচেষ্টাই শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা যেকোনো পরিবর্তনকে হুমকি হিসেবে দেখবে। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসমর্থন। গণআন্দোলনের শক্তিই পারে এই রূপান্তর সম্ভব করতে। ন্যায়বিচারের দাবি যখন রাজপথ থেকে উঠে আসে, তখন তা কেবল আবেগ থাকে না, হয়ে ওঠে পরিবর্তনের অপ্রতিরোধ্য শক্তি। তবে এই আন্দোলনকে হতে হবে সুচিন্তিত, সুসংগঠিত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থার রূপান্তর চাই—এই বোধ থেকেই জন্ম নিতে হবে টেকসই আন্দোলনের।

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লব আসলে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির দাবি রাখে, যেখানে রাষ্ট্র, বাজার এবং সমাজের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারিত হবে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে। এটি স্বীকার করে যে অর্থনৈতিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা হতে হবে টেকসই। সম্পদ সৃষ্টি হোক, তবে তার বণ্টন হোক ন্যায্য। এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে যদি আমরা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করতে পারি, তবেই সম্ভব হবে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ। বাংলাদেশ আজ এই ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীতে শিশু হত্যার নির্মমতা: ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার জমিয়ত

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লবের ডাক

আপডেট সময় : ০৯:২৫:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অর্থনীতি কেবল সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের হিসেব-নিকেশ নয়; বরং এর গভীরে নিহিত রয়েছে মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বৈষম্য শিকড় গেড়ে বসে এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তখন অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস নিছক নীতিগত প্রয়োজনীয়তা থেকে উন্নীত হয় নৈতিক অপরিহার্যতায়।

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতে প্রসার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। তবে এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর বৈষম্যের এক আখ্যান। জিনি সহগের ক্রমবর্ধমান মান, শীর্ষ দশমিকের হাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার ক্রমাগত হ্রাস—এই সূচকগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল কাদের জন্য মূলত কাজ করছে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি আজ চরম চাপের মুখে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির গতি স্থবির। ব্যাংক খাতের লাগামহীন লুটপাট, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট করপোরেট দুর্বৃত্তায়ন এক বিকৃত অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

বাজার অর্থনীতির নামে এক ধরনের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা বন্টন হয় নৈকট্য ও আনুগত্যের ভিত্তিতে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পরও যখন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন সৎ উদ্যোক্তারা হতাশ হন এবং অর্থনীতিতে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লব মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক সুশাসনের আমূল সংস্কার দাবি করে। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। ব্যাংক ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুনঃতফসিলের নামে দুর্নীতির অবসান জরুরি। সুইস ব্যাংকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং সম্পদের অবৈধ উৎস অনুসন্ধানের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

প্রগতিশীল করব্যবস্থার প্রবর্তন আরেকটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে একটি ন্যায্য কর কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। সম্পদ কর প্রবর্তন, ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার এবং কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং পুনর্বণ্টনমূলক নীতি বাস্তবায়নে সক্ষম করবে। বর্তমানে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, যা প্রমাণ করে যে সম্পদশালীরা তাদের ন্যায্য অবদান রাখছেন না। একটি ন্যায্য কর ব্যবস্থা ছাড়া কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা অসম্ভব।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি কল্পনারও অতীত। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং এর আওতা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সহায়তা করতে হবে। বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের জন্য সহজ ঋণপ্রাপ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আয়ের বণ্টন হবে বিকেন্দ্রীভূত। যেকোনো অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার ওপর। যখন বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে অর্থ থাকে, তখনই অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি হয়, বাজার সম্প্রসারিত হয় এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়।

অর্থনৈতিক বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের দিকে ঝুঁকে পড়া। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, কৃষিতে আধুনিক কিন্তু টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শহরায়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত সচেতনতা—এসবই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির ভিত্তি।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। যারা পরিবেশদূষণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রাখে, তারাই এর সবচেয়ে বড় শিকার। উপকূলীয় এলাকার জনগণ, কৃষক সমাজ—এরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি। একই সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতিতে সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল শহুরে উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং গ্রামীণ এলাকা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও যেন এর সুফল পায়, সেজন্য ব্যাপক অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রয়োজন।

তবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের পথ মসৃণ নয়। অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের যেকোনো প্রচেষ্টাই শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা যেকোনো পরিবর্তনকে হুমকি হিসেবে দেখবে। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসমর্থন। গণআন্দোলনের শক্তিই পারে এই রূপান্তর সম্ভব করতে। ন্যায়বিচারের দাবি যখন রাজপথ থেকে উঠে আসে, তখন তা কেবল আবেগ থাকে না, হয়ে ওঠে পরিবর্তনের অপ্রতিরোধ্য শক্তি। তবে এই আন্দোলনকে হতে হবে সুচিন্তিত, সুসংগঠিত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থার রূপান্তর চাই—এই বোধ থেকেই জন্ম নিতে হবে টেকসই আন্দোলনের।

ন্যায়বিচারের দাবিতে অর্থনৈতিক বিপ্লব আসলে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির দাবি রাখে, যেখানে রাষ্ট্র, বাজার এবং সমাজের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারিত হবে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে। এটি স্বীকার করে যে অর্থনৈতিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা হতে হবে টেকসই। সম্পদ সৃষ্টি হোক, তবে তার বণ্টন হোক ন্যায্য। এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে যদি আমরা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করতে পারি, তবেই সম্ভব হবে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ। বাংলাদেশ আজ এই ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।