আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর শিক্ষার হাতেখড়ি হতো ‘সহজ ধারাপাত’ কিংবা ‘বাল্যশিক্ষা’র মধ্য দিয়ে। আজকের যুগের মতো আধুনিক ও চাকচিক্যময় আয়োজন তখন না থাকলেও সেই সহজ পাঠের মধ্যেই নিহিত ছিল শৃঙ্খলা, নীতি এবং নৈতিকতার ভিত্তি। সময়ের বিবর্তনে পাঠ্যপুস্তক বদলেছে, নাম হয়েছে ‘আনন্দপাঠ’ কিংবা ‘ইংলিশ ফর টুডে’, কিন্তু শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য—অর্থাৎ ভাষার বোধ তৈরি এবং চারপাশের বাস্তবতাকে চেনা—অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে, রাজনীতিরও একটি নিজস্ব ‘ধারাপাত’ বা প্রাথমিক ব্যাকরণ রয়েছে। রাজনীতির কৌশল কিংবা জনসম্পৃক্ততার নাম যেভাবেই পরিবর্তন করা হোক না কেন, এর মূল ভিত্তি হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অনেক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে যারা রাজনীতির এই প্রাথমিক পাঠ বা ‘ধারাপাত’ ছাড়াই সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন হতে চেয়েছেন। সাংগঠনিক বাস্তবতা ও জনমানুষের আবেগ বুঝতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী কিংবা সংবিধান প্রণেতাকেও দেখা গেছে সাধারণ নির্বাচনে জামানত হারাতে। এই রাজনৈতিক অপরিপক্কতার বড় উদাহরণ হয়ে আছে ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট। সে সময় প্রবীণ রাজনীতিকদের কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো এমন এক জোটে শামিল হয়েছিল, যার কোনো শক্ত ভিত্তি ছিল না। তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার অবরুদ্ধ দশা এবং বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বের অসহায়ত্ব আজও এক অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে।
সম্প্রতি দেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কণ্ঠে যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি নমনীয় সুর শোনা যায়, তখন জনমনে নতুন করে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। এটি কি কোনো গভীর রাজনৈতিক কৌশল, নাকি ইতিহাসের শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি—সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গণতন্ত্রের নামে বারবার একদলীয় শাসন কিংবা নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন মেয়াদে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং ভিন্নমত দমনের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বিশ্লেষকগণ এক ভিন্নধর্মী নিয়ন্ত্রিত শাসনের যুগ হিসেবে অভিহিত করেন। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও জনমতের প্রতিফলন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বকীয়তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার এই সময়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিতর্কিত ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের ফলে সমাজে এক ধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ গেড়ে বসেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই কোনো রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছে, তখনই গণতন্ত্র সংকুচিত হয়েছে। এই তিক্ত সত্যকে অস্বীকার করা মানেই হলো ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা করা।
রাজনীতির এই সংকটে গণমাধ্যমের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু গণমাধ্যম ও তাদের সম্পাদকগণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার বলয়ের সঙ্গে আপস করে একপাক্ষিক বয়ান তৈরিতে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে লক্ষ্য করে অপপ্রচার এবং ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘উগ্রবাদ’-এর তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও লক্ষ্য করা গেছে। আজ যখন সেই একই ব্যক্তিরা নিজেদের ‘ভয়ের পরিবেশের’ শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন তা নৈতিকভাবে কতটুকু গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন জনমনে থেকেই যায়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানেই জবাবদিহিহীনতা নয়। অতীতের ভুল স্বীকার এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমেই কেবল হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাওয়া সম্ভব। ভিক্টিমহুডের আড়ালে নিজের অতীত ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা সাংবাদিকতার আদর্শের পরিপন্থী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ আর কোনো একমুখী বয়ান শুনতে প্রস্তুত নয়। রাজনীতি হোক কিংবা সাংবাদিকতা—সব ক্ষেত্রেই ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ও জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। যারা রাজনীতির সেই ‘প্রাথমিক ধারাপাত’ উপেক্ষা করে কেবল ক্ষমতার সমীকরণে বিশ্বাসী, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয়ের কাঠগড়াতেই দাঁড় করায়।
রিপোর্টারের নাম 

























