আর মাত্র ক’দিন পরেই জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। প্রচারণার উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে, আর এর মধ্যেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলগুলোর অন্দরে চলছে জয়-পরাজয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ। এবারের নির্বাচনে সম্ভাব্য ফল নির্ধারণে দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে জোর আলোচনা চলছে: একদল বলছেন ‘জেনজি’ বা নতুন প্রজন্মের ভোট, অন্যদল ‘সুইং ভোটারদের’ দিকে ইঙ্গিত করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত ভোটের ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে?
জেনজি, যা জেনারেশন জেড নামেও পরিচিত, বলতে ১৯৯৭ সালের পর জন্ম নেওয়া তরুণ প্রজন্মকে বোঝানো হয়। দেশের মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশ নিয়ে গঠিত এই প্রজন্ম এবারই প্রথম বা দ্বিতীয়বারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় বেড়ে ওঠা এই তরুণরা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রশ্ন করার মানসিকতা। দলীয় আনুগত্য বা ঐতিহাসিক আবেগের চেয়ে তারা বাস্তব সমস্যা ও সমাধানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট – এসব বিষয়ই তাদের রাজনৈতিক ভাবনার কেন্দ্রে থাকে।
অন্যদিকে, সুইং ভোটার বলতে সেইসব ভোটারদের বোঝানো হয়, যারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি স্থায়ীভাবে অনুগত নন। তারা প্রতিটি নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি, ইস্যু, প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও সময়ের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। সহজ কথায়, যেদিকে পরিস্থিতি ও প্রার্থীর ওপর আস্থা বেশি তৈরি হয়, সুইং ভোট সেদিকেই প্রবাহিত হয়। সংখ্যায় সবসময় বড় না হলেও, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে সুইং ভোটাররাই অনেক সময় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেন, তাই নির্বাচনী বিশ্লেষণে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্বাচনী অঙ্কে এখন বড় কৌতূহল হচ্ছে, জেনজি কি সত্যিই নির্ধারক শক্তি, নাকি সুইং ভোটই শেষ কথা বলবে? প্রযুক্তিতে বেড়ে ওঠা জেনজি সচেতন, প্রশ্নকর্তা এবং ইস্যুভিত্তিক হলেও ভোটের মাঠে তাদের উপস্থিতি ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণ এখনও পরীক্ষাধীন। বিপরীতে, সুইং ভোটাররা পরিস্থিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার পাল্লায় সিদ্ধান্ত বদলান এবং ভোটের ফল উল্টে দিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় ভুল হলো জেনজিকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘লাইক’ বা ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে দেখা। বাস্তবে জেনজি চায় অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও সম্মান। তাদের কথা শোনা না হলে তারা হয় ভোট থেকে দূরে থাকবে, নয়তো অপ্রত্যাশিতভাবে বড় ধরনের ‘সুইং’ তৈরি করবে। একইভাবে, সুইং ভোটারদের শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখিয়ে সন্তুষ্ট করা কঠিন; তাদের কাছে এখন বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিকতা বড় ইস্যু।
আসন্ন নির্বাচনে জেনজিদের ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, নতুন ভোটারের একটি বড় অংশ জেনজি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, জেনজিরা দলীয় আনুগত্যে কম আবদ্ধ; তারা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা দেখতে চায়, ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে সুইং ভোটারের মতোই আচরণ করতে পারে। তৃতীয়ত, জেনজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়। তারা ট্রেন্ড তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে এবং অন্য ভোটারদের ভাবনায় প্রভাব ফেলে। সরাসরি ভোট না দিলেও তারা রাজনৈতিক আলোচনার দিক নির্ধারণ করে।
সুতরাং, জেনজি নাকি সুইং ভোট – এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো শব্দে দেওয়া যায় না। বর্তমান নির্বাচনে সুইং ভোটাররা হয়তো সরাসরি ফল নির্ধারণ করবেন, কিন্তু জেনজিরা নির্ধারণ করছে রাজনৈতিক আলোচনার দিক, চাপ সৃষ্টি করছে নীতি ও আচরণে পরিবর্তনের জন্য। তারা হয়তো এখনই ব্যালট বাক্সে চূড়ান্ত শক্তি নয়, কিন্তু তারা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মানচিত্র আঁকছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বলছে, তরুণরা এখন আর ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমান। দলীয় রাজনীতি, ঐতিহ্য বা নেতার ব্যক্তিগত ক্যারিশমার চেয়ে তাদের কাছে পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই প্রশ্নগুলোই রাজনীতির নতুন ধারা তৈরি করছে।
যে দল জেনজিকে শুধু ট্রেন্ড হিসেবে দেখবে এবং সুইং ভোটারকে কেবল সংখ্যার হিসাব হিসেবে ধরবে, তারা ভুল করবে। কারণ আগামী দিনগুলোতে জেনজি আর প্রান্তিক শক্তি থাকবে না, তারা হবে কেন্দ্রীয়। তাই এই নির্বাচন শুধু বর্তমানের হিসাব নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
রিপোর্টারের নাম 

























