ঢাকা ০৮:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি: জনআকাঙ্ক্ষা বনাম প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৭:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ দুই দশক পর বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা জনমনে ব্যাপক আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। তবে এই আশার আলোয় কিছুটা ফাটলও দেখা দিচ্ছে, যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। মূলত ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে বিদেশি শক্তির নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং তৎকালীন প্রভাবশালী কূটনৈতিক মহলের তৎপরতা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মালিকানা ছিনিয়ে নেয়। এর পরবর্তী ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো ছিল আরও বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছাড়া এ দেশের মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক রায় প্রদানের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে অনেকে কেবল সাধারণ নির্বাচন হিসেবে দেখেন না; বরং এটি ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী ‘গণভোট’। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের মতো প্রভাবশালী শক্তির পতন থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কারণ, জনবিচ্ছিন্ন অভিজাততন্ত্রকে মানুষ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এ দেশে ভোট জালিয়াতি ও বিরোধী পক্ষকে দমনের অপসংস্কৃতি শুরু হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিপুল বিজয় এবং বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীদের বাধা দেওয়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক নির্মূল বা বিলোপ তত্ত্ব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেই সময় থেকেই মূলত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বিভাজন ও তীব্র অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকাল ছিল একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সময়। তার সময়ে ১৯ দফার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য ও দেশজ স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ৪১ শতাংশের বেশি ভোট পেলেও কারচুপির বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি, যা তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উল্লেখযোগ্য দিক। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে একটি লড়াকু রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বয়কট এবং আপসহীন অবস্থানের কারণে তার নেতৃত্ব সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে দুর্নীতির কিছু অভিযোগ এবং ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট দলটিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। উত্তরাধিকারের রাজনীতি থাকলেও নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক কৌশল নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মিত্র নির্বাচনে দলটি কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। বর্তমানে জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার যে আত্মত্যাগ, তা কোনো বিশেষ দলের একক অর্জনের চেয়ে বরং ‘জনঅংশীদারত্বমূলক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ দাবি। প্রায় ১৪০০ তরুণের প্রাণদান এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে নস্যাৎ করার যেকোনো চেষ্টা জাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সময়েও প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার একটি মানসিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই ধ্বংস করে না, বরং রাষ্ট্রকে ‘আমিই রাষ্ট্র’ নামক চরম আত্মবিনাশী পথে নিয়ে যায়। যেকোনো সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান অন্তরায় হলো এই আধিপত্যবাদী মানসিকতা।

পরিশেষে, আসন্ন নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়; এটি হওয়া উচিত পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা এবং আধিপত্যের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—একটি প্রভাবমুক্ত ও প্রশ্নাতীত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে জনঅংশীদারত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জনআকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘকাল দমিত রাখা যায় না; শেষ পর্যন্ত জনগণের বিজয় অনিবার্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোট গণনায় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ৫০ আসনে জামায়াতকে হারানো হয়েছে: গোলাম পরওয়ার

বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি: জনআকাঙ্ক্ষা বনাম প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতি

আপডেট সময় : ০৯:৩৭:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ দুই দশক পর বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা জনমনে ব্যাপক আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। তবে এই আশার আলোয় কিছুটা ফাটলও দেখা দিচ্ছে, যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। মূলত ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে বিদেশি শক্তির নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং তৎকালীন প্রভাবশালী কূটনৈতিক মহলের তৎপরতা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মালিকানা ছিনিয়ে নেয়। এর পরবর্তী ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো ছিল আরও বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছাড়া এ দেশের মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক রায় প্রদানের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে অনেকে কেবল সাধারণ নির্বাচন হিসেবে দেখেন না; বরং এটি ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী ‘গণভোট’। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের মতো প্রভাবশালী শক্তির পতন থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কারণ, জনবিচ্ছিন্ন অভিজাততন্ত্রকে মানুষ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এ দেশে ভোট জালিয়াতি ও বিরোধী পক্ষকে দমনের অপসংস্কৃতি শুরু হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের বিপুল বিজয় এবং বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীদের বাধা দেওয়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক নির্মূল বা বিলোপ তত্ত্ব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেই সময় থেকেই মূলত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বিভাজন ও তীব্র অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকাল ছিল একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সময়। তার সময়ে ১৯ দফার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য ও দেশজ স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ৪১ শতাংশের বেশি ভোট পেলেও কারচুপির বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি, যা তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উল্লেখযোগ্য দিক। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে একটি লড়াকু রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বয়কট এবং আপসহীন অবস্থানের কারণে তার নেতৃত্ব সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে দুর্নীতির কিছু অভিযোগ এবং ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট দলটিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। উত্তরাধিকারের রাজনীতি থাকলেও নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক কৌশল নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মিত্র নির্বাচনে দলটি কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। বর্তমানে জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার যে আত্মত্যাগ, তা কোনো বিশেষ দলের একক অর্জনের চেয়ে বরং ‘জনঅংশীদারত্বমূলক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ দাবি। প্রায় ১৪০০ তরুণের প্রাণদান এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে নস্যাৎ করার যেকোনো চেষ্টা জাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সময়েও প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার একটি মানসিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই ধ্বংস করে না, বরং রাষ্ট্রকে ‘আমিই রাষ্ট্র’ নামক চরম আত্মবিনাশী পথে নিয়ে যায়। যেকোনো সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান অন্তরায় হলো এই আধিপত্যবাদী মানসিকতা।

পরিশেষে, আসন্ন নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়; এটি হওয়া উচিত পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা এবং আধিপত্যের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—একটি প্রভাবমুক্ত ও প্রশ্নাতীত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে জনঅংশীদারত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জনআকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘকাল দমিত রাখা যায় না; শেষ পর্যন্ত জনগণের বিজয় অনিবার্য।