ঢাকা ১১:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মহিমান্বিত শবেবরাত: বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২২:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা একটি জাতির স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কোনো জাতির ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠান যখন তাকে অন্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা পরিচয়ে ভাস্বর করে, তখন তা হয়ে ওঠে পরম আদরণীয় ও সংরক্ষণীয়। ধর্ম-বর্ণ বা মতভেদ নির্বিশেষে বাংলার জনমানুষের কাছে ‘শবেবরাত’ কেবল একটি ধর্মীয় রজনী নয়, বরং এটি এ দেশের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবহমান কাল ধরে বাংলার জনপদে শবেবরাত ‘ভাগ্য-রজনী’ হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, এই রাতে মহান আল্লাহ আগামী এক বছরের জন্য বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সারারাত ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকেন। নিজেদের এবং পরিবারের ইহজাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পাশাপাশি মৃত স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য তারা বিশেষ প্রার্থনা করেন। এই রাতে গোরস্তানে গিয়ে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করার দৃশ্যটি বাংলার এক চিরচেনা রূপ।

শবেবরাতের একটি মানবিক ও সামাজিক দিক হলো দান-সদকা ও আপ্যায়ন। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রতিবেশীদের মাঝে হালুয়া-রুটি ও মিষ্টান্ন বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এক অনন্য প্রয়াস দেখা যায়। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি এটি বাংলার আতিথেয়তার সংস্কৃতিকেও প্রতিফলিত করে। তবে সময়ের আবর্তে এই উৎসবের কিছু বিচ্যুতিও লক্ষ্য করা যায়। এক সময় অন্ধকার রাতে মসজিদে বা গোরস্তানে যাওয়ার সুবিধার্থে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানোর চল ছিল। বর্তমানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও আলোকসজ্জার আতিশয্য এবং আতশবাজির যে রেওয়াজ দেখা যায়, তা ধর্মীয় গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি অপচয়ের নামান্তর।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মোগল আমল থেকে শুরু করে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার প্রভাবে এই উপমহাদেশে শবেবরাত পালনের বিশেষ ধারা তৈরি হয়েছে। তবে এই উৎসবের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায়। তাফসিরকারকদের মতে, সূরা আদ-দুখানে বর্ণিত ‘বরকতময় রজনী’র ব্যাখ্যায় কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ শাবান মাসের মধ্যবর্তী এই রাতকে নির্দেশ করেছেন। যদিও কেউ কেউ একে ‘শবে কদর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তবে ইমাম ইকরিমাহর মতো প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ একে শবেবরাত হিসেবেই অভিহিত করেছেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বকীয়তা নষ্ট করার নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কিছু মহলে শবেবরাত পালনকে ‘বিদআত’ বা ধর্মে নব-উদ্ভাবিত বিষয় হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামের ইতিহাসের প্রথিতযশা ইমাম ও ফকিহগণ এই রাতের বিশেষ মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়নিষ্ঠ খলিফা হিসেবে পরিচিত উমর বিন আব্দুল আজিজ এই রাতে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি কঠোরভাবে বিদআত বিরোধী হিসেবে পরিচিত ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও এই রাতের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক মত পোষণ করেছেন।

‘শবেবরাত’ শব্দটি মূলত ফারসি। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি। অর্থাৎ এটি হলো মুক্তির রজনী। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ সর্বনিম্ন আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের প্রতি আহ্বান জানান—কে আছো ক্ষমা প্রার্থী, যাকে আমি ক্ষমা করব? কে আছো রিজিক প্রার্থী, যাকে আমি রিজিক দান করব? এই পবিত্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুমিন বান্দারা নফল নামাজ, তসবিহ পাঠ এবং দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করেন।

পরিশেষে বলা যায়, শবেবরাত বাংলার মানুষের আত্মিক শুদ্ধি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। হাজার বছরের এই ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস যেন কোনো অপসংস্কৃতির আবর্তে হারিয়ে না যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ইবাদতের গাম্ভীর্য বজায় রেখে এবং শরিয়তসম্মত পন্থায় এই রজনী উদযাপনের মাধ্যমেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। বাংলার এই শাশ্বত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্রশিবিরের ইফতার মাহফিলে শিক্ষার্থীদের ঢল, নৈতিকতা ও তাকওয়ার বার্তা

মহিমান্বিত শবেবরাত: বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

আপডেট সময় : ০৯:২২:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা একটি জাতির স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কোনো জাতির ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠান যখন তাকে অন্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা পরিচয়ে ভাস্বর করে, তখন তা হয়ে ওঠে পরম আদরণীয় ও সংরক্ষণীয়। ধর্ম-বর্ণ বা মতভেদ নির্বিশেষে বাংলার জনমানুষের কাছে ‘শবেবরাত’ কেবল একটি ধর্মীয় রজনী নয়, বরং এটি এ দেশের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবহমান কাল ধরে বাংলার জনপদে শবেবরাত ‘ভাগ্য-রজনী’ হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, এই রাতে মহান আল্লাহ আগামী এক বছরের জন্য বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সারারাত ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকেন। নিজেদের এবং পরিবারের ইহজাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পাশাপাশি মৃত স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য তারা বিশেষ প্রার্থনা করেন। এই রাতে গোরস্তানে গিয়ে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করার দৃশ্যটি বাংলার এক চিরচেনা রূপ।

শবেবরাতের একটি মানবিক ও সামাজিক দিক হলো দান-সদকা ও আপ্যায়ন। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রতিবেশীদের মাঝে হালুয়া-রুটি ও মিষ্টান্ন বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এক অনন্য প্রয়াস দেখা যায়। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি এটি বাংলার আতিথেয়তার সংস্কৃতিকেও প্রতিফলিত করে। তবে সময়ের আবর্তে এই উৎসবের কিছু বিচ্যুতিও লক্ষ্য করা যায়। এক সময় অন্ধকার রাতে মসজিদে বা গোরস্তানে যাওয়ার সুবিধার্থে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানোর চল ছিল। বর্তমানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও আলোকসজ্জার আতিশয্য এবং আতশবাজির যে রেওয়াজ দেখা যায়, তা ধর্মীয় গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি অপচয়ের নামান্তর।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মোগল আমল থেকে শুরু করে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার প্রভাবে এই উপমহাদেশে শবেবরাত পালনের বিশেষ ধারা তৈরি হয়েছে। তবে এই উৎসবের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায়। তাফসিরকারকদের মতে, সূরা আদ-দুখানে বর্ণিত ‘বরকতময় রজনী’র ব্যাখ্যায় কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ শাবান মাসের মধ্যবর্তী এই রাতকে নির্দেশ করেছেন। যদিও কেউ কেউ একে ‘শবে কদর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, তবে ইমাম ইকরিমাহর মতো প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ একে শবেবরাত হিসেবেই অভিহিত করেছেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বকীয়তা নষ্ট করার নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কিছু মহলে শবেবরাত পালনকে ‘বিদআত’ বা ধর্মে নব-উদ্ভাবিত বিষয় হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামের ইতিহাসের প্রথিতযশা ইমাম ও ফকিহগণ এই রাতের বিশেষ মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়নিষ্ঠ খলিফা হিসেবে পরিচিত উমর বিন আব্দুল আজিজ এই রাতে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি কঠোরভাবে বিদআত বিরোধী হিসেবে পরিচিত ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও এই রাতের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক মত পোষণ করেছেন।

‘শবেবরাত’ শব্দটি মূলত ফারসি। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি। অর্থাৎ এটি হলো মুক্তির রজনী। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ সর্বনিম্ন আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের প্রতি আহ্বান জানান—কে আছো ক্ষমা প্রার্থী, যাকে আমি ক্ষমা করব? কে আছো রিজিক প্রার্থী, যাকে আমি রিজিক দান করব? এই পবিত্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুমিন বান্দারা নফল নামাজ, তসবিহ পাঠ এবং দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করেন।

পরিশেষে বলা যায়, শবেবরাত বাংলার মানুষের আত্মিক শুদ্ধি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। হাজার বছরের এই ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস যেন কোনো অপসংস্কৃতির আবর্তে হারিয়ে না যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ইবাদতের গাম্ভীর্য বজায় রেখে এবং শরিয়তসম্মত পন্থায় এই রজনী উদযাপনের মাধ্যমেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। বাংলার এই শাশ্বত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।