চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম। জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) ব্যানারে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতির ফলে স্থবিরতা নেমে এসেছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে। এতে প্রতিদিন গড়ে শতকোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। উচ্চ আদালতের রায় সরকারের পক্ষে যাওয়ার পর এই কার্যক্রম গতি পায়। তবে শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ। এর প্রতিবাদে গত শনিবার ও রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হয়। আজ সোমবার সকালেও নতুন করে একই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের ফলে বন্দরের জেটিগুলোতে সীমিত পরিসরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা চললেও, বন্দর থেকে পণ্য খালাস এবং নতুন পণ্য প্রবেশ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে বন্দরের ইয়ার্ড ও বেসরকারি অফডকগুলোতে তীব্র জট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে (সিএমপি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। বন্দর এলাকাকে প্রথম শ্রেণির কেপিআইভুক্ত (গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা) স্থাপনা উল্লেখ করে সেখানে সব ধরনের মিছিল, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। এছাড়া আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে ১১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে এবং আরও ১৮০ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মবিরতি পালন করলেও বিকল্প ব্যবস্থায় বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বন্দরের শৃঙ্খলা ও কাজের গতি ফেরাতে শ্রমিকদের বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
অন্যদিকে, নিজেদের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থে এবং বন্দরের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা বিদেশি অপারেটর নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত মানবেন না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারা জানান, বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে এই আন্দোলন দমন করা যাবে না।
এদিকে, বন্দরের এই অচলাবস্থায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী নেতারা। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্দর স্থবির থাকার কারণে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা (BICDA) জানিয়েছে, দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ব্যবসায়ীদের মতে, দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং গত তিন দিনে ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
রিপোর্টারের নাম 























