বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরটি দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবহনের ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন করে। আধুনিক অবকাঠামো ও দক্ষ কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার কারণে এটি আঞ্চলিক বাণিজ্যেও অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখছে। মূলত এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ সুদৃঢ় হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) তার ১৩৮ বছরের দীর্ঘ পথচলায় সমৃদ্ধি ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আধুনিকায়ন, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেষ্ট।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে জাতীয় অস্থিরতার সময় যখন বন্দর এলাকা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছিল, তখন রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে শক্ত হাতে হাল ধরেন। তাঁর গতিশীল ও কৌশলী পদক্ষেপের ফলে বন্দরে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংকটের সময়ে তাঁর এই সময়োচিত সিদ্ধান্ত প্রকৃত নেতৃত্বের সার্থকতা প্রমাণ করেছে।
বর্তমান প্রশাসনের দূরদর্শী পরিচালনায় চবক আজ একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বমানের বন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। গত এক বছরে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বন্দরটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে, যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে নতুন মাইলফলক
২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে। বিগত ৪৮ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই অর্থবছরে ৩২,৯৬,০৬৭ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪% বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৩১,৬৮,৬৯০ টিইইউ।
২০২৪ সালেও বন্দরের কার্যক্রম ছিল ঈর্ষণীয়। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭.৪২% এবং মোট কার্গো ওঠানামায় ৩.১১% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা এবং ধর্মঘটের মতো বাধা থাকা সত্ত্বেও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে জাহাজের গড় অপেক্ষমাণ সময় কমিয়ে মাত্র এক দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

রাজস্ব ও মুনাফায় ধারাবাহিক উন্নতি
আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য অত্যন্ত সফল। এ সময়ে মোট রাজস্ব আয় ৮.২২% বৃদ্ধি পেয়ে ৫,২২৭.৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যয় ৯.৪৫% বাড়লেও বন্দরের নিট উদ্বৃত্ত ৭.২৭% বৃদ্ধি পেয়ে ২,৯১২.৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান বন্দরের মজবুত আর্থিক ভিত্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার পরিচয় দেয়।
জাতীয় কোষাগারে বিশেষ অবদান
চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিবছরই সরকারের রাজস্ব ভাণ্ডারে বড় অংকের অর্থ প্রদান করে আসছে। গত পাঁচ বছরে জাতীয় কোষাগারে মোট ৭,২০৩.০৬ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১,৭৬৫.২৬ কোটি টাকা প্রদানের মাধ্যমে চবক সরকারের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

মানবসম্পদ উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ
কর্মদক্ষতা বাড়াতে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। ৩৬৫টি শূন্য পদে নতুন নিয়োগ এবং ৯১৬ জন কর্মীর পদোন্নতি বন্দরের ইতিহাসে একটি সাহসী পদক্ষেপ। এছাড়া কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের কাজ চলছে।
টেকসই কল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
আর্থিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর শিক্ষা ও জনকল্যাণেও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি কলেজ এবং ১টি মাদ্রাসা পরিচালনা করছে। নারী শিক্ষা ও কল্যাণে ‘সিপিএ মহিলা সংঘ’ প্রশংসনীয় কাজ করছে। এছাড়া আধুনিক বন্দর হাসপাতাল ও ‘পোর্ট রিপাবলিক ক্লাব’ যথাক্রমে স্বাস্থ্যসেবা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অবদান রাখছে। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ ও কর্মীদের বোনাস প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একটি মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে রূপান্তর ও গতিশীলতা
আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান সংহত করতে চবক বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে:
- ক. বে টার্মিনাল: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিতব্য এই প্রকল্পটিকে বাংলাদেশের নৌ-বাণিজ্যের ‘গেম চেঞ্জার’ বলা হচ্ছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এটি চালু হলে বড় জাহাজ ভেড়ানো সহজ হবে এবং খরচ বহুগুণ কমে আসবে।
- খ. মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর: ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পে জাইকার অর্থায়নে ৬,২০০ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে। এটি ৮,০০০ টিইইউ ক্ষমতার জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করবে।
- গ. লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল (এলসিটি): পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় আন্তর্জাতিক অপারেটরদের মাধ্যমে এই টার্মিনালটি আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, যা কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
- ঘ. নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি): বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সিডিডিএল এটি পরিচালনা করছে এবং প্রথম মাসেই কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সাফল্যের ছাপ রেখেছে।
- ঙ. গ্রিন চ্যানেল: অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও গতি বাড়িয়েছে।
- চ. মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বন্দরের পাশে একটি আধুনিক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাল রূপান্তর
চট্টগ্রাম বন্দর এখন একটি স্মার্ট ও অটোমেটেড প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছে। ই-গেট পাস, অনলাইন পেমেন্ট এবং ‘অনলাইন এজেন্ট ডেস্ক’ চালুর ফলে গ্রাহকসেবা অনেক সহজ হয়েছে। বর্তমানে কিউআর কোড স্ক্যানিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত বন্দরে প্রবেশ ও ফি প্রদান করা যাচ্ছে। এছাড়া ‘মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো’ ও ‘ভিটিএমআইএস’ সিস্টেমের মাধ্যমে কার্গো ট্র্যাকিং ও জাহাজ বার্থিং প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে।
নীতি সংস্কার ও অংশীজন সমন্বয়
শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করতে এনবিআর ও কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে চবক। নিলামযোগ্য ও বিপজ্জনক কন্টেইনার দ্রুত অপসারণের মাধ্যমে বন্দরের যানজট কমানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৌশলগত মাস্টার প্ল্যান ও গ্রিন পোর্ট
জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার সাথে মিল রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষায় ‘গ্রিন মেরিটাইম সেক্টর’ গড়ার লক্ষ্যে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া সব বন্দরকে একটি সমন্বিত কৌশলের (NPMS) আওতায় আনার কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা (ISPS Code)
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন কোস্ট গার্ডের নিরীক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কোনো নেতিবাচক মন্তব্য ছাড়াই উত্তীর্ণ হয়েছে, যা বন্দরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার এক অনন্য স্বীকৃতি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: বিশ্বমানের লজিস্টিক হাব
চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি বৈশ্বিক মেরিটাইম হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে নিচের রূপান্তরমূলক পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে:
- রপ্তানিমুখী ডকইয়ার্ড: মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বড় জাহাজ মেরামতের ডকইয়ার্ড নির্মাণ।
- জমির সর্বোত্তম ব্যবহার: কৌশলগত জোনিংয়ের মাধ্যমে বন্দর এলাকার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
- ৫G প্রযুক্তির ব্যবহার: ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ৫G নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে তথ্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনা।
- স্যাটেলাইট পোর্ট সিটি: মূল বন্দরের ওপর চাপ কমাতে একটি পরিকল্পিত আধুনিক বন্দর শহর গড়ে তোলা।
উপসংহার
গত এক বছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শুধু এগিয়ে যায়নি, বরং এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আধুনিকায়ন, রেকর্ড প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকার কারণে এটি আজ বাংলাদেশের গর্ব। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ডিজিটাল রূপান্তর ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে চবক নিজেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করেছে। নেতৃত্বের দূরদর্শী পরিকল্পনায় বন্দরটি আজ একটি টেকসই ও উদ্ভাবননির্ভর সামুদ্রিক অর্থনীতি গড়ার পথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত করা।
রিপোর্টারের নাম 




















