বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত পাঁচ বছরে রাজস্ব আয়, উদ্বৃত্ত এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে দেশের এই প্রধান অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারটি গড়ে ১৩.০৮ শতাংশ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি গড়ে ১৮.৪২ শতাংশ রাজস্ব উদ্বৃত্ত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে।
মূলত সেবার মান অক্ষুণ্ণ রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার কার্যকর কৌশলই এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বন্দরের কর্মকর্তারা। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং এর বিপরীতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে নিট উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকা, যা গত পাঁচ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালেও সংস্থাটি ২ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত অর্জন করেছিল, যখন তাদের মোট আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা।
বিগত কয়েক বছরের আর্থিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে তাদের রাজস্ব উদ্বৃত্ত বাড়িয়ে চলেছে। ২০২৩ সালে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা এবং ২০২১ সালে ছিল ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। প্রতি বছর আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান বৃদ্ধির মাধ্যমে সংস্থাটি তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে উত্তরোত্তর শক্তিশালী করেছে। রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির বিচারে ২০২৪ সালটি ছিল বন্দরের জন্য সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি বছর, কারণ ওই সময়ে আগের বছরের তুলনায় আয় ২১.৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে ১৬.৬৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৬.১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালেও ৭.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের আয়ের এই ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আয়ের পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত পাঁচ বছরে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৭.৫৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করায় গত দুই বছর যাবত ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৫ সালে রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা আরও কমিয়ে ৬.৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল, যদিও এর আগের বছর ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে বেড়ে ১০.১৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এমন কঠোরতা বন্দরের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও মজবুত করেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও বিশাল অঙ্কের অর্থ জমা দিচ্ছে। বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুকের দেওয়া তথ্যমতে, ভ্যাট, ট্যাক্স এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) মিলিয়ে গত পাঁচ পঞ্জিকাবর্ষে সংস্থাটি সরকারি কোষাগারে মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে কর বাবদ ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বাবদ ৩ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। বছরভিত্তিক হিসেবে দেখা যায়, ২০২১ সালে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা জমা দেওয়ার পর ২০২২ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ১ হাজার ৫১৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা জমা দেওয়ার পর সর্বশেষ ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রদান করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৪১ শতাংশ বেশি।
রিপোর্টারের নাম 























