ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

নীলফামারী-৪: উর্দুভাষী ভোটার টানতে প্রার্থীদের অভিনব প্রচার কৌশল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪২:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ আসনের সৈয়দপুর উপজেলায় এক ব্যতিক্রমী প্রচার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই জনপদের একটি বড় অংশ উর্দুভাষী হওয়ায় ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দুতেও নির্বাচনি মাইকিং ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনি বার্তা ও প্রতিশ্রুতি উর্দু গান ও গজলের সুরে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সৈয়দপুরের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক উর্দুভাষী মানুষ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আরও কিছু লোক স্থানীয় ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেন। স্থায়ী বাসিন্দারা আগে থেকেই ভোটার থাকলেও, ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ক্যাম্পে বসবাসকারী প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ভোটাধিকার লাভ করেন। বর্তমানে সৈয়দপুর পৌরসভার মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই এই উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী। ফলে এই বিপুল পরিমাণ ভোট যেকোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

নির্বাচনি মাঠে থাকা প্রার্থীরা মনে করছেন, উর্দুভাষী ভোটারদের কাছে তাদের নিজস্ব ভাষায় বার্তা পৌঁছাতে পারলে তা অধিক কার্যকর হয়। এতে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক সম্পর্কে সাধারণ ভোটাররা সহজেই ধারণা পাচ্ছেন। এই কৌশলকে প্রার্থীরা তাদের প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জনসভা ও পথসভাগুলোতেও প্রার্থীদের অনেককে বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

তবে এই প্রচার পদ্ধতি নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই দেশে অন্য কোনো ভাষায় নির্বাচনি প্রচার চালানো ভাষাগত চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। অন্যদিকে, অনেকে মনে করছেন উর্দুভাষীরাও এ দেশের নাগরিক এবং ভোটার। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং তাদের কাছে প্রার্থীর বার্তা পৌঁছে দিতে তাদের মাতৃভাষা ব্যবহার করা কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিরই একটি অংশ।

ক্যাম্পের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি নির্বাচনের আগেই প্রার্থীরা তাদের জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর তার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না। হাতিখানা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও স্থানীয় উর্দুভাষী নেতাদের মতে, তারা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই এবার তারা এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবেন, যিনি কেবল প্রতিশ্রুতি নয় বরং ক্যাম্পের অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

নির্বাচনি প্রচারণায় ভিন্ন ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনি আচরণবিধিতে ভাষার ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রার্থীরা আইন ও বিধি মেনে নিজস্ব কৌশলে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতে পারেন। তবে প্রচারের ভাষা যেন কোনোভাবেই উসকানিমূলক না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নীলফামারী-৪ আসনের এই নির্বাচনি চিত্র কেবল ভোট প্রাপ্তির কৌশল নয়, বরং এটি স্থানীয় রাজনীতিতে ভাষা ও সংস্কৃতির এক জটিল সমীকরণকে সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত এই ভাষাগত আবেগ ও কৌশল ভোটের বাক্সে কার পক্ষে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের পাল্টা হামলা: ইসরাইলের জ্বালানি অবকাঠামো ও যোগাযোগ কেন্দ্রে আঘাত

নীলফামারী-৪: উর্দুভাষী ভোটার টানতে প্রার্থীদের অভিনব প্রচার কৌশল

আপডেট সময় : ০৮:৪২:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ আসনের সৈয়দপুর উপজেলায় এক ব্যতিক্রমী প্রচার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই জনপদের একটি বড় অংশ উর্দুভাষী হওয়ায় ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দুতেও নির্বাচনি মাইকিং ও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনি বার্তা ও প্রতিশ্রুতি উর্দু গান ও গজলের সুরে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সৈয়দপুরের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক উর্দুভাষী মানুষ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা আরও কিছু লোক স্থানীয় ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেন। স্থায়ী বাসিন্দারা আগে থেকেই ভোটার থাকলেও, ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ক্যাম্পে বসবাসকারী প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ভোটাধিকার লাভ করেন। বর্তমানে সৈয়দপুর পৌরসভার মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই এই উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী। ফলে এই বিপুল পরিমাণ ভোট যেকোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

নির্বাচনি মাঠে থাকা প্রার্থীরা মনে করছেন, উর্দুভাষী ভোটারদের কাছে তাদের নিজস্ব ভাষায় বার্তা পৌঁছাতে পারলে তা অধিক কার্যকর হয়। এতে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক সম্পর্কে সাধারণ ভোটাররা সহজেই ধারণা পাচ্ছেন। এই কৌশলকে প্রার্থীরা তাদের প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জনসভা ও পথসভাগুলোতেও প্রার্থীদের অনেককে বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

তবে এই প্রচার পদ্ধতি নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই দেশে অন্য কোনো ভাষায় নির্বাচনি প্রচার চালানো ভাষাগত চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। অন্যদিকে, অনেকে মনে করছেন উর্দুভাষীরাও এ দেশের নাগরিক এবং ভোটার। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং তাদের কাছে প্রার্থীর বার্তা পৌঁছে দিতে তাদের মাতৃভাষা ব্যবহার করা কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিরই একটি অংশ।

ক্যাম্পের সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি নির্বাচনের আগেই প্রার্থীরা তাদের জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর তার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না। হাতিখানা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও স্থানীয় উর্দুভাষী নেতাদের মতে, তারা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই এবার তারা এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবেন, যিনি কেবল প্রতিশ্রুতি নয় বরং ক্যাম্পের অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

নির্বাচনি প্রচারণায় ভিন্ন ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনি আচরণবিধিতে ভাষার ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রার্থীরা আইন ও বিধি মেনে নিজস্ব কৌশলে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতে পারেন। তবে প্রচারের ভাষা যেন কোনোভাবেই উসকানিমূলক না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নীলফামারী-৪ আসনের এই নির্বাচনি চিত্র কেবল ভোট প্রাপ্তির কৌশল নয়, বরং এটি স্থানীয় রাজনীতিতে ভাষা ও সংস্কৃতির এক জটিল সমীকরণকে সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত এই ভাষাগত আবেগ ও কৌশল ভোটের বাক্সে কার পক্ষে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।