সীমিত সম্পদে অনন্য স্থাপত্যের নকশা: কাশেফ চৌধুরীর নতুন বইয়ে আলো-ছায়ার কারুকাজ
ঢাকা: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশি স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী তাঁর নতুন মনোগ্রাফ “Meditations in Entropy: The Work of Kashef Chowdhury / URBANA”–এর মাধ্যমে স্থাপত্যকে জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি এবং সমষ্টিগত স্মৃতির এক গভীর ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে ক্রাউন প্লাজা বলরুমে ‘আর্কিকানেক্ট’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বইটির উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে কাশেফ চৌধুরী তাঁর প্রায় তিন দশকের স্থাপত্যচর্চার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা পরিবেশগত ঝুঁকি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো অঞ্চলে স্থাপত্য কেবল রূপ বা নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। বরং জলবায়ু চাপ, মানুষের সহনশীলতা এবং স্থানিক বাস্তবতার প্রতি অর্থবহ সাড়া দেওয়াই এর মূল দায়িত্ব। তাঁর এই বইটি মূলত গত ২০ বছরের জলবায়ু সংবেদনশীল সামাজিক প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছে, যেখানে বর্তমান সংকট ও বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। এছাড়াও, সীমিত বাজেটে আলো-ছায়াকে নকশার প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল, গ্রামমুখী চিন্তা এবং শহরমুখী অভিবাসনের বিপরীতে গ্রামে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ ও সেখানকার ছোট ছোট সামাজিক প্রকল্পগুলো এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
স্থপতি কাশেফ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “এই বইটি কোনো স্থাপত্য-অবয়বের উদযাপন নয়; বরং এটি একটি প্রক্রিয়ার প্রতিফলন—যেখানে সংযম, প্রেক্ষাপট এবং সহমর্মিতা থেকে স্থাপত্যের জন্ম হয়।” সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা পার্ক বুকস কর্তৃক প্রকাশিত ৫০০ পৃষ্ঠার বেশি এই মনোগ্রাফটি কাশেফ চৌধুরী/URBANA–র কাজের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা। এতে স্কেচ, নকশা, আলোকচিত্র এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখার মাধ্যমে গত ৩০ বছরের স্থাপত্যচর্চা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৮টি বাস্তবায়িত প্রকল্পের ইতিহাসও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বইটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থাপত্য আলোকচিত্রী হেলেন বিনের আলোকচিত্র এবং কেনেথ ফ্র্যাম্পটন, উইলিয়াম জে. আর. কার্টিস, রবার্ট ম্যাককার্টার, আইনুন নিশাত ও ফিলিপ উরস্প্রুং–এর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক সি. আর. আবরার। তিনি তাঁর বক্তব্যে সমাজ ও পরিবেশগত বাস্তবতার গভীরে প্রোথিত স্থাপত্যচিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বলেন, কাশেফ চৌধুরীর কাজ প্রমাণ করে যে নকশা কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের চ্যালেঞ্জের প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মি. রেতো রেংগ্লি। তিনি মন্তব্য করেন, কাশেফ চৌধুরীর এই বইটি আগামী দিনের স্থাপত্যশিল্পের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, আগামী ৫০ বছর পর পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে মানুষকে চাষাবাদের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং এই ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মাথায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
অতিথি বক্তা হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, প্রখ্যাত স্থপতি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস এবং ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি)–এর সভাপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ। তাঁরা বইটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য-নথি হিসেবে উল্লেখ করেন, যা স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চাকে বৈশ্বিক আলোচনার পরিসরে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার বিভাগের প্রফেসর ড. শামসুল ওয়ারেশ বলেন, “আর্কিটেকচার শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি একটি বড় দায়িত্ব।” এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবু সাঈদ মো. আহমেদ উল্লেখ করেন, বইটি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি স্থপতিদের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উদাহরণ হতে পারে।
শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার বইটিকে “খুব সাবলীল ও তথ্যবহুল” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি সীমিত সম্পদ ও ভূ-প্রকৃতির কাঠামো বিশ্লেষণ করে অবকাঠামো তৈরির বিষয় তুলে ধরেছে। তিনি আরও বলেন, বইটিতে নির্মাণ কাজের খরচ কমানোর সহজ পদ্ধতি এবং আলো ও বাতাসের অপূর্ব সমন্বয়ের বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট স্থপতি, শিক্ষাবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 























