ঢাকা ০১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

“সাভারকে সিটি করপোরেশন করা হচ্ছে, মানুষ এতে খুশি হলেও কিছুটা চিন্তাও আছে।”

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে

সরকার সাভার পৌরসভা আর আশুলিয়াকে এক করে ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ বানানোর যে সিদ্ধান্তটা নীতিগতভাবে নিয়েছে, তা নিয়ে সেখানকার মানুষের মধ্যে খুশি আর চিন্তা—দুই রকম প্রতিক্রিয়াই দেখা যাচ্ছে। একদিকে, মানুষ আশা করছে যে সিটি করপোরেশন হলে হয়তো নাগরিক সুবিধা বাড়বে, এলাকা আরও উন্নত হবে। অন্যদিকে, নতুন এই ব্যবস্থার কারণে ট্যাক্স বেড়ে যায় কি না, বা অন্য কী কী পরিবর্তন আসে, তা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তাও কাজ করছে। অবশ্য, এটা এখনো সরকারের একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত, এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়ার কাজ এখনো চলছে।

ওখানকার লোকেরা বলছেন, সিটি করপোরেশন হলে রাস্তাঘাট ভালো হবে, ড্রেনের ব্যবস্থা উন্নত হবে, আর অন্য সরকারি সেবাও ভালো পাওয়া যাবে। তাছাড়া, সাভার আর আশুলিয়া এক হয়ে বড় একটা প্রশাসনিক কাঠামো হলে দুই এলাকার মধ্যে কাজের মিল (সমন্বয়) বাড়বে। এতে উন্নয়নের কাজও তাড়াতাড়ি হবে বলে আশা করা যায়। আরও একটা ব্যাপার হলো, “আশুলিয়া উন্নয়ন ফোরাম”-এর মতো কিছু সংগঠন অনেকদিন ধরেই আশুলিয়াকে পৌরসভা করা, হাসপাতাল বানানো বা জলাবদ্ধতা কমানোর মতো দাবি করে আসছিল। এখন সিটি করপোরেশন হলে সেই দাবিগুলো পূরণ হওয়াটাও সহজ হতে পারে।

আবার কিছু লোক ভয় পাচ্ছেন যে, নতুন সিটি করপোরেশন হয়ে গেলে হয়তো ট্যাক্স (কর) অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এই যে নতুন একটা ব্যবস্থায় যাওয়া হচ্ছে, এতে কিছু সমস্যা বা পরিবর্তনও তো আসতে পারে। সব ধরনের সুবিধা চালু হতেও হয়তো বেশ সময় লেগে যাবে। সবার জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা (আবাসন), যাতায়াত (পরিবহন) আর অন্যান্য দরকারি সেবা নিশ্চিত করাটা এই নতুন সিটি করপোরেশনের জন্য বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জও হতে পারে।

সরকার শুধু সাভার-আশুলিয়াকেই এক করে ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি, একই সাথে কেরানীগঞ্জকে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা অথবা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেতরে আনারও একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এটা অনুমোদন দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখা থেকে একটা প্রজ্ঞাপনও (অফিসিয়াল চিঠি) জারি করা হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মু. মাহমুদ উল্লাহ মারুফ সই করা একটা চিঠিতে এই খবরটা জানানো হয়।

এই নতুন ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ গড়া হবে সাভার উপজেলার মডেল থানা আর আশুলিয়া থানা এলাকা নিয়ে। এটা হয়ে গেলে সাভার পৌরসভা আর এই দুই থানার অধীনে যতগুলো ইউনিয়ন আছে, সেগুলো আর থাকবে না (বিলুপ্ত হবে)। এখন দেশে মোট ১২টা সিটি করপোরেশন আছে—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জ। সাভার হতে যাচ্ছে দেশের ১৩ নম্বর সিটি করপোরেশন। এছাড়া দেশে এখন ৩৩০টা পৌরসভা আছে। কেরানীগঞ্জ যদি পৌরসভা হয়, তাহলে সেটা হবে ৩৩১তম।

সব মিলিয়ে সাভারে এখন খুশি, চিন্তা আর আলোচনা—সবই চলছে। কেউ কেউ তো খুশিতে মিষ্টিও বিলি করছেন, ফেসবুকে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে ধন্যবাদও জানাচ্ছেন। তবে, অনেকে আবার সমালোচনাও করছেন। যেমন কেউ কেউ লিখেছেন, ‘সাভার সিটি করপোরেশন—শুধু নামটাই বড়, সুবিধাটা কোথায়? সাভারকে সিটি করপোরেশন বানালে উন্নয়ন হবে না, বরং বোঝা বাড়বে। ট্যাক্স বাড়বে, খরচ বাড়বে, কিন্তু সুবিধা সেই আগের মতোই থাকবে। রাস্তা ভাঙা, ড্রেন বন্ধ, সবখানে ময়লা—এই অবস্থায় সিটি করপোরেশন? এসব উন্নয়ন শুধু কাগজেই হবে, আসলে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।’

মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তা হলো ওয়াসার পানি আর ট্যাক্স (কর) নিয়ে। যদিও সিটি করপোরেশন হচ্ছে শুনে বেশিরভাগ মানুষই খুশি। তারপরও, ট্যাক্স বাড়া, ঢাকা ওয়াসার পানি আসা আর ঠিকমতো নাগরিক সুবিধা পাওয়া নিয়ে একটা চিন্তা তো আছেই। তবে সবার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো ঐ ওয়াসার পানি নিয়েই।

পৌর এলাকার একজন বাসিন্দা, নাজমা আক্তার, বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে সাভারের আরও উন্নতি হবে, এটা ঠিক। কিন্তু আমরা ঢাকা ওয়াসার ঐ ময়লা পানি ব্যবহার করতে চাই না। সিটি করপোরেশন হোক, কিন্তু আমরা এখানের পরিষ্কার পানিই পান করতে চাই। এজন্য যেন ব্যবস্থা করা হয়। এটাই আমাদের চাওয়া।’

ওই এলাকারই আরেকজন বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওয়াসার ময়লা পানি তো কমবেশি সবাইকেই খেতে হয়। সিটি করপোরেশন হলে আমরা সাভারের পরিষ্কার পানিই খাবো। ঢাকা ওয়াসার পানি আমরা খাবো না। তবে এটা ঠিক যে, এই উদ্যোগের ফলে সাভার-আশুলিয়া উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে।’

ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়ন মো. খোরশেদ আলমও মনে করছেন যে, সিটি করপোরেশন হলে নাগরিক সুবিধা বাড়বে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যারা পৌরসভায় থাকি, নাগরিক সুবিধা বলতে গেলে কিছুই পাই না। তবে সিটি করপোরেশন হলে যে সুবিধা বাড়বে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এর জন্য যে কাজগুলো করা দরকার, তা আগেভাগেই করতে হবে। এমন যেন না হয় যে, সিটি করপোরেশন হলো, মানুষের ট্যাক্সও বাড়লো, কিন্তু নাগরিক সুবিধা বাড়লো না; তখন মানুষ এটা ভালো চোখে দেখবে না। উল্টো সবাই রেগে যাবে।’

ওয়াসার পানির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাভারের পানি খেয়েই অভ্যস্ত। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর আমরা ঢাকা ওয়াসাকে এখানে bienvenida জানাতে পারবো না। কারণ ওয়াসার পানি ভালো না। আমরা ওয়াসামুক্ত একটা সিটি করপোরেশন চাই। আমরা যেন সাভারের পানিই পান করতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে।’

আশুলিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা, যিনি আবাসন ব্যবসা করেন, সেই মো. রুবেল মন্ডল বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে সব মিলিয়ে একটা উন্নয়ন তো হবেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ইউনিয়ন পরিষদকে আমরা যে ট্যাক্স দিই, সিটি করপোরেশন হলে তার চেয়ে অনেক বেশি ট্যাক্স দিতে হবে, যেমন হোল্ডিং ট্যাক্স বা ট্রেড লাইসেন্স ফি। এতে সাধারণ মানুষের ওপর টাকার একটা চাপ বাড়বে।’

আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা ও ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান মোহন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হওয়াটা একটা অনেক বড় ব্যাপার। এতে আমাদের এলাকার উন্নতি হবে, মানুষের জীবনযাত্রার মানও ভালো হবে। এলাকার উন্নয়নের জন্য বড় বড় বাজেট আসবে। এগুলো সবই এলাকার জন্য ভালো।’

সাভার পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. ছামছুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে নাগরিক সেবার ওপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়বে না। বরং ভালোই হবে, শত শত কোটি টাকার বিদেশি যেসব প্রজেক্ট আছে, সেগুলো তখন সাভারে আসবে।’ আর ওয়াসার পানির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হওয়ার পর নতুন মেয়র আর কাউন্সিলররা যদি মনে করেন যে, সাভারের মানুষের ওয়াসার পানি দরকার, তাহলে তারা নেবেন। আর যদি তারা না চান, তাহলে নেবেন না।’

ওখানকার স্থানীয় মানুষজন বলছেন, সাভার যখন পৌরসভা ছিল, তখন থেকেই এখানে যানজট, জলাবদ্ধতা, ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার না করা আর নাগরিক সুবিধার অভাব—এগুলো পুরোনো সমস্যা। এর আসল কারণ হলো, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কোনো মিল ছিল না, ট্যাক্সও ঠিকমতো আদায় হতো না, সেবাও পাওয়া যেত না, যখন যা খুশি উন্নয়ন হতো (অপরিকল্পিত) আর টাকা-পয়সারও ঠিকঠাক ব্যবস্থাপনা ছিল না। তবে, এখন অনেকেই আশা করছেন যে, সিটি করপোরেশন হলে হয়তো এই সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

সরকারের প্রস্তাবেও বলা হয়েছে যে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই শিল্পকারখানা, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে বেড়েছে, তাতে সাভার এখন একটা বিশাল শহরে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট সম্পদ বা লোকবল পৌরসভার হাতে নেই। ওদিকে আশুলিয়া এলাকায়ও প্রচুর গার্মেন্টস, শ্রমিকের থাকার জায়গা আর আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে। একটা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এই বিশাল এলাকার জন্য পরিকল্পিত শহর গড়া, ময়লা পরিষ্কার, গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার সুবিধা দেওয়া, ভালো পানি দেওয়া বা পরিবেশ ঠিক রাখার মতো সেবাগুলো দেওয়া সম্ভব না। একারণে আশুলিয়ার মানুষজনকেও সব সময় জ্যাম, ঠিকমতো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা আর ভাঙাচোরা রাস্তার মতো সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, ঢাকা শহর বড় হওয়ায় আর মানুষ বেড়ে যাওয়ায় কেরানীগঞ্জ উপজেলাও খুব দ্রুত, কিন্তু কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই একটা শহরে পরিণত হচ্ছে। সেখানে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় রাস্তাঘাট, ড্রেন, পানি, ময়লা পরিষ্কার বা স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি সেবাগুলোও ঠিকমতো দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ কেরানীগঞ্জে যদি পরিকল্পনা করে উন্নয়ন করা যায়, তাহলে এটাকে রাজধানীর পাশেই একটা আধুনিক আর জমজমাট উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সব মিলিয়ে একটা পুরোপুরি পরিকল্পনা দরকার। এই পুরো বিষয়টার ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমস্যা হলো, অনেকেই আইন মানতে চান না। পরিবেশের কথা না ভেবেই আমাদের খাল, বিল, নদীতে ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ছাড়াই প্রচুর ময়লা ফেলা হচ্ছে। এই সবকিছুকে একটা নিয়মের মধ্যে আনতে গেলে আমাদের সিটি করপোরেশন দরকার। এর জন্য ক্ষমতা দরকার আর সরকারের ইচ্ছাও দরকার। যেন এই পুরো এলাকাটার একটা ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন হয়। তবে, এটা ঠিক যে, মানুষকে সুবিধা দিতে গেলে অবশ্যই ট্যাক্স বাড়াতে হবে। আবার ট্যাক্স বাড়ালে সেই টাকাটা যে ঠিকঠাক মতো খরচ হচ্ছে, সেটাও দেখতে হবে। একারণেই একটা সবদিক সামলানো (সামগ্রিক) পরিকল্পনা দরকার।’

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

“সাভারকে সিটি করপোরেশন করা হচ্ছে, মানুষ এতে খুশি হলেও কিছুটা চিন্তাও আছে।”

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

সরকার সাভার পৌরসভা আর আশুলিয়াকে এক করে ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ বানানোর যে সিদ্ধান্তটা নীতিগতভাবে নিয়েছে, তা নিয়ে সেখানকার মানুষের মধ্যে খুশি আর চিন্তা—দুই রকম প্রতিক্রিয়াই দেখা যাচ্ছে। একদিকে, মানুষ আশা করছে যে সিটি করপোরেশন হলে হয়তো নাগরিক সুবিধা বাড়বে, এলাকা আরও উন্নত হবে। অন্যদিকে, নতুন এই ব্যবস্থার কারণে ট্যাক্স বেড়ে যায় কি না, বা অন্য কী কী পরিবর্তন আসে, তা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তাও কাজ করছে। অবশ্য, এটা এখনো সরকারের একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত, এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়ার কাজ এখনো চলছে।

ওখানকার লোকেরা বলছেন, সিটি করপোরেশন হলে রাস্তাঘাট ভালো হবে, ড্রেনের ব্যবস্থা উন্নত হবে, আর অন্য সরকারি সেবাও ভালো পাওয়া যাবে। তাছাড়া, সাভার আর আশুলিয়া এক হয়ে বড় একটা প্রশাসনিক কাঠামো হলে দুই এলাকার মধ্যে কাজের মিল (সমন্বয়) বাড়বে। এতে উন্নয়নের কাজও তাড়াতাড়ি হবে বলে আশা করা যায়। আরও একটা ব্যাপার হলো, “আশুলিয়া উন্নয়ন ফোরাম”-এর মতো কিছু সংগঠন অনেকদিন ধরেই আশুলিয়াকে পৌরসভা করা, হাসপাতাল বানানো বা জলাবদ্ধতা কমানোর মতো দাবি করে আসছিল। এখন সিটি করপোরেশন হলে সেই দাবিগুলো পূরণ হওয়াটাও সহজ হতে পারে।

আবার কিছু লোক ভয় পাচ্ছেন যে, নতুন সিটি করপোরেশন হয়ে গেলে হয়তো ট্যাক্স (কর) অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এই যে নতুন একটা ব্যবস্থায় যাওয়া হচ্ছে, এতে কিছু সমস্যা বা পরিবর্তনও তো আসতে পারে। সব ধরনের সুবিধা চালু হতেও হয়তো বেশ সময় লেগে যাবে। সবার জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা (আবাসন), যাতায়াত (পরিবহন) আর অন্যান্য দরকারি সেবা নিশ্চিত করাটা এই নতুন সিটি করপোরেশনের জন্য বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জও হতে পারে।

সরকার শুধু সাভার-আশুলিয়াকেই এক করে ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি, একই সাথে কেরানীগঞ্জকে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা অথবা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেতরে আনারও একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এটা অনুমোদন দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখা থেকে একটা প্রজ্ঞাপনও (অফিসিয়াল চিঠি) জারি করা হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মু. মাহমুদ উল্লাহ মারুফ সই করা একটা চিঠিতে এই খবরটা জানানো হয়।

এই নতুন ‘সাভার সিটি করপোরেশন’ গড়া হবে সাভার উপজেলার মডেল থানা আর আশুলিয়া থানা এলাকা নিয়ে। এটা হয়ে গেলে সাভার পৌরসভা আর এই দুই থানার অধীনে যতগুলো ইউনিয়ন আছে, সেগুলো আর থাকবে না (বিলুপ্ত হবে)। এখন দেশে মোট ১২টা সিটি করপোরেশন আছে—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জ। সাভার হতে যাচ্ছে দেশের ১৩ নম্বর সিটি করপোরেশন। এছাড়া দেশে এখন ৩৩০টা পৌরসভা আছে। কেরানীগঞ্জ যদি পৌরসভা হয়, তাহলে সেটা হবে ৩৩১তম।

সব মিলিয়ে সাভারে এখন খুশি, চিন্তা আর আলোচনা—সবই চলছে। কেউ কেউ তো খুশিতে মিষ্টিও বিলি করছেন, ফেসবুকে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে ধন্যবাদও জানাচ্ছেন। তবে, অনেকে আবার সমালোচনাও করছেন। যেমন কেউ কেউ লিখেছেন, ‘সাভার সিটি করপোরেশন—শুধু নামটাই বড়, সুবিধাটা কোথায়? সাভারকে সিটি করপোরেশন বানালে উন্নয়ন হবে না, বরং বোঝা বাড়বে। ট্যাক্স বাড়বে, খরচ বাড়বে, কিন্তু সুবিধা সেই আগের মতোই থাকবে। রাস্তা ভাঙা, ড্রেন বন্ধ, সবখানে ময়লা—এই অবস্থায় সিটি করপোরেশন? এসব উন্নয়ন শুধু কাগজেই হবে, আসলে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।’

মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তা হলো ওয়াসার পানি আর ট্যাক্স (কর) নিয়ে। যদিও সিটি করপোরেশন হচ্ছে শুনে বেশিরভাগ মানুষই খুশি। তারপরও, ট্যাক্স বাড়া, ঢাকা ওয়াসার পানি আসা আর ঠিকমতো নাগরিক সুবিধা পাওয়া নিয়ে একটা চিন্তা তো আছেই। তবে সবার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো ঐ ওয়াসার পানি নিয়েই।

পৌর এলাকার একজন বাসিন্দা, নাজমা আক্তার, বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে সাভারের আরও উন্নতি হবে, এটা ঠিক। কিন্তু আমরা ঢাকা ওয়াসার ঐ ময়লা পানি ব্যবহার করতে চাই না। সিটি করপোরেশন হোক, কিন্তু আমরা এখানের পরিষ্কার পানিই পান করতে চাই। এজন্য যেন ব্যবস্থা করা হয়। এটাই আমাদের চাওয়া।’

ওই এলাকারই আরেকজন বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওয়াসার ময়লা পানি তো কমবেশি সবাইকেই খেতে হয়। সিটি করপোরেশন হলে আমরা সাভারের পরিষ্কার পানিই খাবো। ঢাকা ওয়াসার পানি আমরা খাবো না। তবে এটা ঠিক যে, এই উদ্যোগের ফলে সাভার-আশুলিয়া উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে।’

ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়ন মো. খোরশেদ আলমও মনে করছেন যে, সিটি করপোরেশন হলে নাগরিক সুবিধা বাড়বে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যারা পৌরসভায় থাকি, নাগরিক সুবিধা বলতে গেলে কিছুই পাই না। তবে সিটি করপোরেশন হলে যে সুবিধা বাড়বে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এর জন্য যে কাজগুলো করা দরকার, তা আগেভাগেই করতে হবে। এমন যেন না হয় যে, সিটি করপোরেশন হলো, মানুষের ট্যাক্সও বাড়লো, কিন্তু নাগরিক সুবিধা বাড়লো না; তখন মানুষ এটা ভালো চোখে দেখবে না। উল্টো সবাই রেগে যাবে।’

ওয়াসার পানির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাভারের পানি খেয়েই অভ্যস্ত। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর আমরা ঢাকা ওয়াসাকে এখানে bienvenida জানাতে পারবো না। কারণ ওয়াসার পানি ভালো না। আমরা ওয়াসামুক্ত একটা সিটি করপোরেশন চাই। আমরা যেন সাভারের পানিই পান করতে পারি, সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে।’

আশুলিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা, যিনি আবাসন ব্যবসা করেন, সেই মো. রুবেল মন্ডল বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে সব মিলিয়ে একটা উন্নয়ন তো হবেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ইউনিয়ন পরিষদকে আমরা যে ট্যাক্স দিই, সিটি করপোরেশন হলে তার চেয়ে অনেক বেশি ট্যাক্স দিতে হবে, যেমন হোল্ডিং ট্যাক্স বা ট্রেড লাইসেন্স ফি। এতে সাধারণ মানুষের ওপর টাকার একটা চাপ বাড়বে।’

আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা ও ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান মোহন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হওয়াটা একটা অনেক বড় ব্যাপার। এতে আমাদের এলাকার উন্নতি হবে, মানুষের জীবনযাত্রার মানও ভালো হবে। এলাকার উন্নয়নের জন্য বড় বড় বাজেট আসবে। এগুলো সবই এলাকার জন্য ভালো।’

সাভার পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. ছামছুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন হলে নাগরিক সেবার ওপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়বে না। বরং ভালোই হবে, শত শত কোটি টাকার বিদেশি যেসব প্রজেক্ট আছে, সেগুলো তখন সাভারে আসবে।’ আর ওয়াসার পানির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন হওয়ার পর নতুন মেয়র আর কাউন্সিলররা যদি মনে করেন যে, সাভারের মানুষের ওয়াসার পানি দরকার, তাহলে তারা নেবেন। আর যদি তারা না চান, তাহলে নেবেন না।’

ওখানকার স্থানীয় মানুষজন বলছেন, সাভার যখন পৌরসভা ছিল, তখন থেকেই এখানে যানজট, জলাবদ্ধতা, ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার না করা আর নাগরিক সুবিধার অভাব—এগুলো পুরোনো সমস্যা। এর আসল কারণ হলো, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কোনো মিল ছিল না, ট্যাক্সও ঠিকমতো আদায় হতো না, সেবাও পাওয়া যেত না, যখন যা খুশি উন্নয়ন হতো (অপরিকল্পিত) আর টাকা-পয়সারও ঠিকঠাক ব্যবস্থাপনা ছিল না। তবে, এখন অনেকেই আশা করছেন যে, সিটি করপোরেশন হলে হয়তো এই সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

সরকারের প্রস্তাবেও বলা হয়েছে যে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই শিল্পকারখানা, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে বেড়েছে, তাতে সাভার এখন একটা বিশাল শহরে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট সম্পদ বা লোকবল পৌরসভার হাতে নেই। ওদিকে আশুলিয়া এলাকায়ও প্রচুর গার্মেন্টস, শ্রমিকের থাকার জায়গা আর আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে। একটা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এই বিশাল এলাকার জন্য পরিকল্পিত শহর গড়া, ময়লা পরিষ্কার, গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য বা শিক্ষার সুবিধা দেওয়া, ভালো পানি দেওয়া বা পরিবেশ ঠিক রাখার মতো সেবাগুলো দেওয়া সম্ভব না। একারণে আশুলিয়ার মানুষজনকেও সব সময় জ্যাম, ঠিকমতো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা আর ভাঙাচোরা রাস্তার মতো সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, ঢাকা শহর বড় হওয়ায় আর মানুষ বেড়ে যাওয়ায় কেরানীগঞ্জ উপজেলাও খুব দ্রুত, কিন্তু কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই একটা শহরে পরিণত হচ্ছে। সেখানে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় রাস্তাঘাট, ড্রেন, পানি, ময়লা পরিষ্কার বা স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি সেবাগুলোও ঠিকমতো দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ কেরানীগঞ্জে যদি পরিকল্পনা করে উন্নয়ন করা যায়, তাহলে এটাকে রাজধানীর পাশেই একটা আধুনিক আর জমজমাট উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সব মিলিয়ে একটা পুরোপুরি পরিকল্পনা দরকার। এই পুরো বিষয়টার ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমস্যা হলো, অনেকেই আইন মানতে চান না। পরিবেশের কথা না ভেবেই আমাদের খাল, বিল, নদীতে ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ছাড়াই প্রচুর ময়লা ফেলা হচ্ছে। এই সবকিছুকে একটা নিয়মের মধ্যে আনতে গেলে আমাদের সিটি করপোরেশন দরকার। এর জন্য ক্ষমতা দরকার আর সরকারের ইচ্ছাও দরকার। যেন এই পুরো এলাকাটার একটা ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন হয়। তবে, এটা ঠিক যে, মানুষকে সুবিধা দিতে গেলে অবশ্যই ট্যাক্স বাড়াতে হবে। আবার ট্যাক্স বাড়ালে সেই টাকাটা যে ঠিকঠাক মতো খরচ হচ্ছে, সেটাও দেখতে হবে। একারণেই একটা সবদিক সামলানো (সামগ্রিক) পরিকল্পনা দরকার।’