আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক ক্রিকেটীয় টানাপড়েন এবং বিসিসিআইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে আইসিসির ভূমিকা এখন কাঠগড়ায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কা ও ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জটিলতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর গভীরে রয়েছে ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতার দাপট। আইসিসির ওপর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছেন ভারতেরই প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষক শারদা উগ্রা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আইসিসি ও বিসিসিআইয়ের মধ্যকার সম্পর্কের সমালোচনা করেছেন। শারদা উগ্রার মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইসিসি কার্যত বিসিসিআইয়ের একটি বর্ধিত কার্যালয় বা ‘দুবাই অফিসে’ পরিণত হয়েছে। বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছার বাইরে আইসিসির স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা এখন নেই বললেই চলে।
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল ইস্যু এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা শঙ্কা। অভিযোগ উঠেছে, মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে কোনো ক্রিকেটীয় কারণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘অলিখিত ও অনানুষ্ঠানিক’ রাজনৈতিক নির্দেশনা। শারদা উগ্রা মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ক্রিকেটের ওপর এসে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মোস্তাফিজের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নিরাপত্তা জনিত কারণে বাংলাদেশ তাদের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আইসিসি সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দেয়। অথচ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে বছরের পর বছর ‘হাইব্রিড মডেল’ অনুসরণ করে আসছে আইসিসি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দ্বিমুখী নীতিকে ‘চরম দ্বিচারিতা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের প্রশ্ন, ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবির ক্ষেত্রে তা কেন কার্যকর হবে না?
শারদা উগ্রার মতে, আইসিসির এই নতিস্বীকার এবং বিসিসিআইয়ের ‘দাদাগিরি’ ক্রিকেটের বিশ্বজনীন ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। ক্রিকেট একসময় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করলেও, এখন তা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের আগে এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ টুর্নামেন্টের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, আইসিসির এই দুর্বল অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের জন্য অশনি সংকেত। বিশেষ করে অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্তির যে প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে আইসিসির এমন প্রশ্নবিদ্ধ শাসনব্যবস্থা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বোর্ডের আর্থিক ও রাজনৈতিক শক্তির কাছে বিশ্ব ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার এভাবে আত্মসমর্পণ খেলাটির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান না হলে বিশ্বকাপের জৌলুস হারানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক গভীর বিভাজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























