বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ ও বৈধ মাধ্যম হিসেবে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ না হয়, তবে তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়, যা জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে। এ কারণেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন সবসময়ই একটি সংবেদনশীল অবস্থানে থেকেছে। বিশেষ করে, সাংবিধানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যখন প্রবল হয়, তখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে নির্বাচন একটি মৌলিক পদক্ষেপ। অতীতে বেশ কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্বাচন কেবল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই, এই নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে। সকল অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের জন্য একটি সমতল নির্বাচনী ক্ষেত্র তৈরি করার গুরুদায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত। এই প্রক্রিয়াটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস, যেখানে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।
বিগত দুই দশকে অনুষ্ঠিত চারটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও ইতোমধ্যে তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণের জন্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘পাতানো নির্বাচন হবে না’ এমন ঘোষণা সত্ত্বেও, নির্বাচন প্রকৌশল (ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে জল্পনা-কল্পনা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগকে বিজয়ী ঘোষণা এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন আসনে সুপরিকল্পিতভাবে ফলাফল সাজানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘দিনের ভোট রাতে’ হওয়ার অভিযোগ এবং অনেক কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট পড়ার ঘটনাও নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘ডামি’ প্রার্থী ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর অপকৌশলও সমালোচিত হয়েছে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনায় প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশের সহায়তায় এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও এই অনিয়ম এবং এতে জড়িত হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের নির্বাচন জনগণের ভোটাধিকারকে খর্ব করে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তও পরবর্তীকালে কলুষিত নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
এরও আগে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেও কারচুপিপূর্ণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিছু আসন পূর্বনির্ধারিত ছিল এবং অন্য আসনগুলোতে পছন্দসই প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হয়, যা ভারতীয় আধিপত্যের প্রতি নতজানুতার প্রতিফলন বলে অনেকে মনে করেন।
আসন্ন নির্বাচন নিয়েও কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, বিশেষ করে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জনমনে সংশয় সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশন কতটা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অতীতে দেখা গেছে, যারা অনৈতিকভাবে নির্বাচনে সহায়তা করেছেন, তাদের পরিণতিও সুখকর হয়নি। তাই, দায়মুক্তি নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই নির্বাচন কমিশন ও সরকারের একমাত্র অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর প্রতি অনুরাগ বা আনুগত্য প্রকাশ না করে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করাই নির্বাচন কমিশনের প্রধান কর্তব্য।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে জনগণের ভোটাধিকার হরণের দায় নির্বাচন কমিশনার ও তাদের সহযোগীরা এড়াতে পারেন না। আসন্ন নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে তাদের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























