ঢাকা ০১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন ও ডিপ স্টেটের বাস্তবতা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ইতিহাসের পাতায় অনেক সময়েই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা সবসময় সেই বেদনাবিধুর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা প্রায় দুই হাজার শহীদের আত্মাহুতি এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘নতুন আশা’ নামক এক নতুন শব্দ যোগ করেছিল। রাজপথে ধ্বনিত হয়েছিল জবাবদিহির দাবি, ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আন্দোলনের মাত্র কয়েক মাস পেরোতেই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রের মূল কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু কিছু মুখ বদলেছে।

এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে এক নীরব অথচ সুসংগঠিত বাস্তবতা—বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেট’। ডিপ স্টেট কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি একটি স্থিতিশীল ক্ষমতাকাঠামো, যা নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এখানে নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা প্রায়শই ক্ষণস্থায়ী অতিথি হয়ে থাকেন, আর প্রকৃত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় পর্দার আড়ালে, নথিপত্রের মার্জিনে অথবা গোপন বৈঠকের কক্ষে। সেনা-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা, প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী, বিদেশি শক্তির সঙ্গে জড়িত লবি এবং গণমাধ্যমের একাংশ—এই পাঁচটি স্তম্ভের সমন্বয়েই বাংলাদেশের ডিপ স্টেট কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের এই অদৃশ্য কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, কিন্তু তা ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, আন্দোলন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে পৌঁছালেও, রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। ক্ষমতা হস্তান্তরের নাটক মঞ্চস্থ হলেও, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থেকেছে। সচিবালয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বয়ান এবং ‘স্থিতিশীলতা’র বুলি—সবই রয়ে গেছে আগের মতোই।

শহীদের রক্ত রাষ্ট্রকে বিব্রত করতে পারলেও, বিপর্যস্ত করতে পারেনি। ডিপ স্টেটের প্রথম কৌশল ছিল সময় নষ্ট করা। তদন্ত কমিশন গঠন, বিচারিক প্রতিশ্রুতি, পুনর্বাসনের আশ্বাস, ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন সংস্কারের ঘোষণা—এসবই প্রায়শই ঘোষণার স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। দ্বিতীয় কৌশল ছিল জনমতকে প্রভাবিত করা। গণঅভ্যুত্থানকে ধীরে ধীরে ‘অরাজকতা’, ‘বিদেশি প্ররোচনা’ অথবা ‘চরমপন্থার ঝুঁকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের চরিত্র হনন, তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং সংশয়-সন্দেহ ছড়িয়ে দিয়ে ঐক্য বিনষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণমাধ্যমের একাংশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে, আবার অন্য অংশ কিছু নির্দিষ্ট পক্ষ এবং রাষ্ট্রের ভাষ্যকেই প্রচার করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সময়ে কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রয়ে গেছে। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা পূর্বের মতোই অনাস্থার ছায়ায় রয়েছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কয়েকটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতেই কুক্ষিগত থেকেছে। রাষ্ট্র যেন এক বার্তা দিয়েছে: “তোমরা মরতে পারো, প্রশ্ন করতে পারো; কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।”

এখানেই বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের প্রকৃত শক্তি নিহিত। এটি সবসময় সরাসরি দমন-পীড়ন করে না; বরং জনগণের প্রত্যাশাকে শোষণ করে এবং প্রতিরোধকে ক্লান্ত করে দেয়। বিপ্লবের ভাষাকে প্রশাসনিক ভাষায় রূপান্তরিত করে। রাজপথের স্লোগান মন্ত্রণালয়ের নোটশিটে প্রবেশ করে নির্বিষ হয়ে যায়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে জনগণ এখনো ইতিহাসের চালিকাশক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন এক শক্তি বিদ্যমান, যা গণরায়ের প্রকাশকে সহনীয় সীমার বাইরে যেতে দেয় না। এই শক্তি কোনো নির্দিষ্ট দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; দল আসে যায়, কিন্তু ডিপ স্টেট থেকে যায়।

এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে, শহীদদের রক্ত কেবল স্মৃতিস্তম্ভেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনর্গঠন—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। অন্যথায়, প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান একই প্রশ্ন রেখে শেষ হবে: এত রক্তের পরও কেন কিছুই বদলাল না?

২০২৪ সাল আমাদের শিখিয়েছে যে, স্বপ্ন দেখানো যায়, কিন্তু কাঠামো ভাঙা না গেলে স্বপ্ন রাষ্ট্রে রূপ নেয় না। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে কেবল আবেগের বিস্ফোরণ বা স্লোগান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংযমের সাহস। ডিপ স্টেট ভাঙার অর্থ রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে তার প্রকৃত মালিক—জনগণের—কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতার পালাবদল যতই নাটকীয় হোক না কেন, কাঠামো অক্ষত থাকলে রাষ্ট্র বদলায় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই নির্মম সত্যটি আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, জনমনে নতুন প্রত্যাশা জন্মেছে, অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় নির্বিকার থেকেছে। এর কারণ ডিপ স্টেট বিপ্লবকে সহ্য করতে জানে, কিন্তু সংস্কারকে ভয় পায়।

এই অদৃশ্য শক্তির প্রধান অস্ত্র হলো ‘নিরাপত্তা বয়ান’। ‘জাতীয় স্বার্থ’ এবং ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দ দুটি দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক অধিকার খর্ব করার বৈধ ভাষায় পরিণত হয়েছে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রথমেই এই একচ্ছত্র বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে হবে। নিরাপত্তা রাষ্ট্রের ধারণা থেকে নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণায় উত্তরণ ঘটানো ছাড়া কোনো টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে—এই মৌলিক সত্যকে নীতিগতভাবে স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশে ডিপ স্টেটের আরেকটি গভীর শেকড় হলো আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। সরকার আসে-যায়; কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে ফাইল ও নোটশিট যখন চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। এই বাস্তবতাকে ভাঙতে হলে আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রশাসন হবে নীতির বাস্তবায়নকারী, নীতির মালিক নয়—এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে ডিপ স্টেট কেবল রূপ বদলাবে, বিলুপ্ত হবে না।

নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রশ্ন এড়িয়ে ডিপ স্টেট ভাঙার আলোচনা অসম্পূর্ণ। দুর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ডিপ স্টেটের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। যখন জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না, তখন অদৃশ্য শক্তির জন্য বৈধতার সংকট তৈরি হয় না। তাই নির্বাচন প্রশাসনিক প্রকল্প নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনরুদ্ধার করাই ডিপ স্টেট ভাঙার অন্যতম পূর্বশর্ত।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ডিপ স্টেটের প্রভাব সুস্পষ্ট। কয়েকটি কর্পোরেট ও আর্থিক বলয় যখন রাষ্ট্রনীতির নেপথ্য প্রণেতা হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি জনস্বার্থ থেকে সরে গিয়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং বাজেট প্রণয়নে সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার কেবল শব্দের খেলাই থেকে যাবে।

ডিপ স্টেটের আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী অস্ত্র হলো বয়ান নিয়ন্ত্রণ। কোনটি দেশপ্রেম, কোনটি রাষ্ট্রবিরোধিতা—এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা যার হাতে থাকে, রাষ্ট্র কার্যত তারই দখলে যায়। গণমাধ্যমকে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপে রেখে, সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখে যে রাষ্ট্র চলে, সে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রশ্ন করার অধিকারকে রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে মেনে নিতে হবে, দুর্বলতা হিসেবে নয়।

সবশেষে আসে বিচার বিভাগের প্রশ্ন। বিচার বিভাগ যদি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন থাকে, বাস্তবে নয়, তবে ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধও ভেঙে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ডিপ স্টেটের জন্য অক্সিজেনের মতো কাজ করে। স্বচ্ছ নিয়োগ, রাজনৈতিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে বিচারিক নজরদারি ছাড়া এই অক্সিজেন বন্ধ করা যাবে না।

বাংলাদেশে ডিপ স্টেট ভাঙা সম্ভব, তবে তা কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর কিন্তু অপরিহার্য প্রক্রিয়া। সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; রাষ্ট্র বদলাতে হলে ক্ষমতার অভ্যাস বদলাতে হয়। যদি আমরা সেই অভ্যাস বদলাতে সাহস না করি, তবে প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর যদি সাহস করি, তবে ডিপ স্টেট একদিন আর ছায়া হয়ে থাকবে না—সে শুধু অতীতের ভারী স্মৃতি হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা: তেহরানজুড়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন ও ডিপ স্টেটের বাস্তবতা

আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ইতিহাসের পাতায় অনেক সময়েই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা সবসময় সেই বেদনাবিধুর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা প্রায় দুই হাজার শহীদের আত্মাহুতি এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘নতুন আশা’ নামক এক নতুন শব্দ যোগ করেছিল। রাজপথে ধ্বনিত হয়েছিল জবাবদিহির দাবি, ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আন্দোলনের মাত্র কয়েক মাস পেরোতেই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রের মূল কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু কিছু মুখ বদলেছে।

এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে এক নীরব অথচ সুসংগঠিত বাস্তবতা—বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেট’। ডিপ স্টেট কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি একটি স্থিতিশীল ক্ষমতাকাঠামো, যা নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এখানে নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা প্রায়শই ক্ষণস্থায়ী অতিথি হয়ে থাকেন, আর প্রকৃত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় পর্দার আড়ালে, নথিপত্রের মার্জিনে অথবা গোপন বৈঠকের কক্ষে। সেনা-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা, প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী, বিদেশি শক্তির সঙ্গে জড়িত লবি এবং গণমাধ্যমের একাংশ—এই পাঁচটি স্তম্ভের সমন্বয়েই বাংলাদেশের ডিপ স্টেট কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের এই অদৃশ্য কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, কিন্তু তা ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, আন্দোলন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে পৌঁছালেও, রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। ক্ষমতা হস্তান্তরের নাটক মঞ্চস্থ হলেও, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থেকেছে। সচিবালয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বয়ান এবং ‘স্থিতিশীলতা’র বুলি—সবই রয়ে গেছে আগের মতোই।

শহীদের রক্ত রাষ্ট্রকে বিব্রত করতে পারলেও, বিপর্যস্ত করতে পারেনি। ডিপ স্টেটের প্রথম কৌশল ছিল সময় নষ্ট করা। তদন্ত কমিশন গঠন, বিচারিক প্রতিশ্রুতি, পুনর্বাসনের আশ্বাস, ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন সংস্কারের ঘোষণা—এসবই প্রায়শই ঘোষণার স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। দ্বিতীয় কৌশল ছিল জনমতকে প্রভাবিত করা। গণঅভ্যুত্থানকে ধীরে ধীরে ‘অরাজকতা’, ‘বিদেশি প্ররোচনা’ অথবা ‘চরমপন্থার ঝুঁকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের চরিত্র হনন, তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং সংশয়-সন্দেহ ছড়িয়ে দিয়ে ঐক্য বিনষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণমাধ্যমের একাংশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে, আবার অন্য অংশ কিছু নির্দিষ্ট পক্ষ এবং রাষ্ট্রের ভাষ্যকেই প্রচার করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সময়ে কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রয়ে গেছে। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা পূর্বের মতোই অনাস্থার ছায়ায় রয়েছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কয়েকটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতেই কুক্ষিগত থেকেছে। রাষ্ট্র যেন এক বার্তা দিয়েছে: “তোমরা মরতে পারো, প্রশ্ন করতে পারো; কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।”

এখানেই বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের প্রকৃত শক্তি নিহিত। এটি সবসময় সরাসরি দমন-পীড়ন করে না; বরং জনগণের প্রত্যাশাকে শোষণ করে এবং প্রতিরোধকে ক্লান্ত করে দেয়। বিপ্লবের ভাষাকে প্রশাসনিক ভাষায় রূপান্তরিত করে। রাজপথের স্লোগান মন্ত্রণালয়ের নোটশিটে প্রবেশ করে নির্বিষ হয়ে যায়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে জনগণ এখনো ইতিহাসের চালিকাশক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন এক শক্তি বিদ্যমান, যা গণরায়ের প্রকাশকে সহনীয় সীমার বাইরে যেতে দেয় না। এই শক্তি কোনো নির্দিষ্ট দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; দল আসে যায়, কিন্তু ডিপ স্টেট থেকে যায়।

এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে, শহীদদের রক্ত কেবল স্মৃতিস্তম্ভেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনর্গঠন—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। অন্যথায়, প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান একই প্রশ্ন রেখে শেষ হবে: এত রক্তের পরও কেন কিছুই বদলাল না?

২০২৪ সাল আমাদের শিখিয়েছে যে, স্বপ্ন দেখানো যায়, কিন্তু কাঠামো ভাঙা না গেলে স্বপ্ন রাষ্ট্রে রূপ নেয় না। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে কেবল আবেগের বিস্ফোরণ বা স্লোগান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার এবং রাজনৈতিক সংযমের সাহস। ডিপ স্টেট ভাঙার অর্থ রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে তার প্রকৃত মালিক—জনগণের—কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতার পালাবদল যতই নাটকীয় হোক না কেন, কাঠামো অক্ষত থাকলে রাষ্ট্র বদলায় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই নির্মম সত্যটি আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, জনমনে নতুন প্রত্যাশা জন্মেছে, অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় নির্বিকার থেকেছে। এর কারণ ডিপ স্টেট বিপ্লবকে সহ্য করতে জানে, কিন্তু সংস্কারকে ভয় পায়।

এই অদৃশ্য শক্তির প্রধান অস্ত্র হলো ‘নিরাপত্তা বয়ান’। ‘জাতীয় স্বার্থ’ এবং ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দ দুটি দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক অধিকার খর্ব করার বৈধ ভাষায় পরিণত হয়েছে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রথমেই এই একচ্ছত্র বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে হবে। নিরাপত্তা রাষ্ট্রের ধারণা থেকে নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণায় উত্তরণ ঘটানো ছাড়া কোনো টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে—এই মৌলিক সত্যকে নীতিগতভাবে স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশে ডিপ স্টেটের আরেকটি গভীর শেকড় হলো আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। সরকার আসে-যায়; কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে ফাইল ও নোটশিট যখন চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। এই বাস্তবতাকে ভাঙতে হলে আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রশাসন হবে নীতির বাস্তবায়নকারী, নীতির মালিক নয়—এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে ডিপ স্টেট কেবল রূপ বদলাবে, বিলুপ্ত হবে না।

নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রশ্ন এড়িয়ে ডিপ স্টেট ভাঙার আলোচনা অসম্পূর্ণ। দুর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ডিপ স্টেটের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। যখন জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না, তখন অদৃশ্য শক্তির জন্য বৈধতার সংকট তৈরি হয় না। তাই নির্বাচন প্রশাসনিক প্রকল্প নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনরুদ্ধার করাই ডিপ স্টেট ভাঙার অন্যতম পূর্বশর্ত।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ডিপ স্টেটের প্রভাব সুস্পষ্ট। কয়েকটি কর্পোরেট ও আর্থিক বলয় যখন রাষ্ট্রনীতির নেপথ্য প্রণেতা হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি জনস্বার্থ থেকে সরে গিয়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং বাজেট প্রণয়নে সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার কেবল শব্দের খেলাই থেকে যাবে।

ডিপ স্টেটের আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী অস্ত্র হলো বয়ান নিয়ন্ত্রণ। কোনটি দেশপ্রেম, কোনটি রাষ্ট্রবিরোধিতা—এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা যার হাতে থাকে, রাষ্ট্র কার্যত তারই দখলে যায়। গণমাধ্যমকে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপে রেখে, সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখে যে রাষ্ট্র চলে, সে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রশ্ন করার অধিকারকে রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে মেনে নিতে হবে, দুর্বলতা হিসেবে নয়।

সবশেষে আসে বিচার বিভাগের প্রশ্ন। বিচার বিভাগ যদি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন থাকে, বাস্তবে নয়, তবে ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধও ভেঙে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ডিপ স্টেটের জন্য অক্সিজেনের মতো কাজ করে। স্বচ্ছ নিয়োগ, রাজনৈতিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে বিচারিক নজরদারি ছাড়া এই অক্সিজেন বন্ধ করা যাবে না।

বাংলাদেশে ডিপ স্টেট ভাঙা সম্ভব, তবে তা কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর কিন্তু অপরিহার্য প্রক্রিয়া। সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; রাষ্ট্র বদলাতে হলে ক্ষমতার অভ্যাস বদলাতে হয়। যদি আমরা সেই অভ্যাস বদলাতে সাহস না করি, তবে প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর যদি সাহস করি, তবে ডিপ স্টেট একদিন আর ছায়া হয়ে থাকবে না—সে শুধু অতীতের ভারী স্মৃতি হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।