দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলায়তন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানে এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা ঘিরে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের প্রতিটি জনপদে এখন উৎসবের আমেজ। এবারের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথমবারের মতো একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির।
নির্বাচনী মাঠে এবার সবচেয়ে বড় চমক বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ। তিনি বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রচারণার শুরু থেকেই তিনি ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি বড় অংশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এবারের নির্বাচনে দেশের প্রায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার প্রবাসী ভোটার প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই তরুণ, যাদের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৫৬ লাখ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই এবারের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। প্রথাগত প্রচারণার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো হয়ে উঠেছে প্রধান রণক্ষেত্র। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে জনমনে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা যাচ্ছে একসময়ের দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াত এখন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকবিহীন এই নির্বাচনে প্রায় ১৭ বছর পর সব দলের অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নিবন্ধিত ৫৯টি দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৮টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। মোট প্রার্থী সংখ্যা ১৯৮১ জন। এর মধ্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রয়েছে ২১৫ জন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ১৯৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটার তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সামরিক বাহিনীসহ প্রায় ৮ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ২৬টি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকছেন।
প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘মানদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে ইতিহাসের অন্যতম স্বচ্ছ ও সুন্দর নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া জনগণের রায়ের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হবে।
বিগত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর ওপর গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই তিনটি নির্বাচন ছিল মূলত গণতন্ত্র ধ্বংসের একেকটি নীল নকশা। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম হিসেবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধে কমিশন থেকে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই দেশজুড়ে প্রার্থীদের লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে মুখরিত হয়ে উঠেছে গ্রাম-বাংলার হাটবাজার ও চায়ের দোকান। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের জঞ্জাল পরিষ্কার করে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়ে ভোটাররা উন্মুখ হয়ে আছেন ভোটকেন্দ্রের দিকে। সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পরীক্ষা।
রিপোর্টারের নাম 

























