ঢাকা ০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

নির্বাচন উত্তাপের আড়ালে উদ্বেগ: রাজশাহী বিভাগে ৯২ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো অধরা

দেশের অন্যান্য প্রান্তের ন্যায় রাজশাহী বিভাগেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বইছে নির্বাচনী আমেজ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ততম মোড়—সর্বত্রই এ নির্বাচন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের আড়ালে বিভাগটিতে একটি নীরব উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। গত বছর জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিষ্পন্ন পরিস্থিতি আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, যা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাজশাহী বিভাগে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনার ড. বজলুর রশীদ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত একটি সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান যে, বিভাগের জেলাগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান নেই। তিনি আরও বলেন যে, টুকটাক কিছু সমস্যা থাকলেও সেগুলো সমাধানের যোগ্য।

তবে, একই সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ভিন্ন একটি বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়াটা একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এসব অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহৃত হতে পারে—এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মোট ৩৪৯টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ৯২টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছে। গোলাবারুদের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। লুট হওয়া ১৬ হাজার ৮২২ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার করা গেছে মাত্র পাঁচ হাজার ৭৯৫টি। বাকি ১১ হাজার ২৭ রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে লুট হওয়া শটগানের ১৩ রাউন্ড গুলি গত ২১ জানুয়ারি একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়।

এই অনিষ্পন্ন পরিস্থিতি লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে মোট দুই হাজার ২৭৯টি লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ছিল। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে মাত্র প্রায় এক হাজার ১৩১টি অস্ত্র জমা পড়েছে। বাকি অস্ত্রগুলোর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত নয়। সব মিলিয়ে, বিগত দেড় বছরে রাজশাহী বিভাগে প্রায় সাড়ে ১২০০ অস্ত্র এবং ১১ হাজারের বেশি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে, হারানো অস্ত্রের বড় অংশ ঠিক কার হাতে রয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এই মুহূর্তে কঠিন বলে তারা স্বীকার করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক এই বিষয়টিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবেই দেখছেন না, বরং এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে, এই উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হলে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত প্রবল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন সেনা আটকের ইরানি দাবি ‘মিথ্যাচার’, কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান সেন্টকমের

নির্বাচন উত্তাপের আড়ালে উদ্বেগ: রাজশাহী বিভাগে ৯২ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো অধরা

আপডেট সময় : ০২:৪৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের অন্যান্য প্রান্তের ন্যায় রাজশাহী বিভাগেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বইছে নির্বাচনী আমেজ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ততম মোড়—সর্বত্রই এ নির্বাচন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের আড়ালে বিভাগটিতে একটি নীরব উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। গত বছর জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিষ্পন্ন পরিস্থিতি আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, যা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাজশাহী বিভাগে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনার ড. বজলুর রশীদ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত একটি সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান যে, বিভাগের জেলাগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান নেই। তিনি আরও বলেন যে, টুকটাক কিছু সমস্যা থাকলেও সেগুলো সমাধানের যোগ্য।

তবে, একই সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ভিন্ন একটি বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়াটা একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এসব অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহৃত হতে পারে—এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মোট ৩৪৯টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ৯২টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছে। গোলাবারুদের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। লুট হওয়া ১৬ হাজার ৮২২ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার করা গেছে মাত্র পাঁচ হাজার ৭৯৫টি। বাকি ১১ হাজার ২৭ রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে লুট হওয়া শটগানের ১৩ রাউন্ড গুলি গত ২১ জানুয়ারি একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়।

এই অনিষ্পন্ন পরিস্থিতি লাইসেন্সকৃত অস্ত্রের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে মোট দুই হাজার ২৭৯টি লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ছিল। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এর মধ্যে মাত্র প্রায় এক হাজার ১৩১টি অস্ত্র জমা পড়েছে। বাকি অস্ত্রগুলোর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত নয়। সব মিলিয়ে, বিগত দেড় বছরে রাজশাহী বিভাগে প্রায় সাড়ে ১২০০ অস্ত্র এবং ১১ হাজারের বেশি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে, হারানো অস্ত্রের বড় অংশ ঠিক কার হাতে রয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এই মুহূর্তে কঠিন বলে তারা স্বীকার করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হক এই বিষয়টিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবেই দেখছেন না, বরং এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে, এই উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হলে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত প্রবল।