আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন এক মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারায়, দলটির বিশাল একটি ভোট ব্যাংক এখন কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মাঠ পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই ‘আওয়ামী ভোট’ নিজেদের অনুকূলে নিতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।
চার ভাগে বিভক্ত হতে পারে আওয়ামী ভোট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, আওয়ামী লীগের ভোট মূলত চার ভাগে বিভক্ত হতে পারে:
১. চিহ্নিত নেতাকর্মী: যারা সরাসরি হামলা-মামলার ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ঝুঁকি নেবেন না।
২. দলবদলকারী: যারা ইতিমধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় অন্য দলে (বিশেষ করে বিএনপি বা জামায়াতে) ভিড়ে গেছেন।
৩. সমঝোতাকারী: যাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রার্থীর ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক বিশেষ ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ হয়েছে
৪. নীরব সমর্থক: এটি সবচেয়ে বড় গ্রুপ। তারা আদর্শিকভাবে আওয়ামীপন্থী হলেও এই মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার কথা ভেবে এমন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, যার দ্বারা তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন না।
বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি কৌশল
রাজনৈতিক দলগুলো এখন আওয়ামী সমর্থকদের আস্থা অর্জনে ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে।
- বিএনপির বার্তা: গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি আওয়ামী সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, “আপনারা বিপদে পড়বেন না। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না। আমরা আপনাদের পাশে আছি।” বিএনপি মূলত ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ভোট’ ও ‘আঞ্চলিক সম্প্রীতি’র কার্ড ব্যবহার করে এই ভোটারদের কাছে টানতে চাইছে।
- জামায়াতের নমনীয়তা: জামায়াত নেতারা অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘ভাই’ বা ‘বন্ধু’ সম্বোধন করে ভোট চাইছেন। গত বৃহস্পতিবার চৌদ্দগ্রামে জামায়াত নেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মঞ্চে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারের উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। জামায়াত এখন আগের কঠোর অবস্থান বদলে ‘ইনসাফ ও নিরাপত্তার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট টানার চেষ্টা করছে।
হিন্দু ভোটার ও সংখ্যালঘু সমীকরণ
বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি অমুসলিম ভোটার রয়েছেন, যাদের ভোট ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। এই বৃহৎ গোষ্ঠীটিকে আশ্বস্ত করতে গত দুর্গাপূজার সময় থেকেই বিএনপি ও জামায়াত বিশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে মন্দির পাহারা দেওয়াসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। মির্জা ফখরুলও তাঁর বক্তব্যে সকল ধর্মের মানুষের সমান নিরাপত্তার কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
পরিসংখ্যানের গুরুত্ব
বিগত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর (১৯৯১-২০০৮) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক ৩০ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করেছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটও জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব ভারতে বা কারাগারে থাকায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা দিশেহারা। এই বিশাল কর্মী ও সমর্থক গোষ্ঠী যে প্রার্থীর পক্ষে যাবে, তাঁরই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই দৌড়ঝাঁপকে সমালোচনা করে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের ভোট নেওয়ার জন্য বিএনপি ও জামায়াত রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে।” মামলার নিশ্চয়তা দিয়ে ভোট কেনা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন। শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটে এই ‘নিষিদ্ধ দলের ভোটাররা’ কী প্রতিফলন ঘটান, তা-ই হবে এবারের নির্বাচনের বড় চমক।
রিপোর্টারের নাম 























