ঢাকা ০৯:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

কমছে না বিদ্যুতের দাম, পিডিবির লোকসান চরমে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুই বৃহৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র—পায়রা ও রামপাল থেকে বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টা আপাতত সফল হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে দাম পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হলেও পায়রা কেন্দ্রের অংশীদার চীনের সিএমসি এবং রামপাল কেন্দ্রের অংশীদার ভারতের এনটিপিসি তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) আগের মতোই উচ্চমূল্যে এই দুই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।

পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ীর দামের তুলনা

পিডিবি বর্তমানে সরকারি কেন্দ্র মাতারবাড়ী থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে, তার তুলনায় পায়রা ও রামপালের দাম অনেক বেশি। নিচের সারণিতে এর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামউৎপাদন ক্ষমতাপ্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামমালিকানা/অংশীদার
মাতারবাড়ী১২০০ মেগাওয়াট৮.৪৫ টাকাসরকারি (সিপিজিসিবিএল)
পায়রা১৩২০ মেগাওয়াট১২.০০ টাকাবাংলাদেশ-চীন (বিসিপিসিএল)
রামপাল১৩২০ মেগাওয়াট১৩.৫৭ টাকাবাংলাদেশ-ভারত (বিআইএফপিসিএল)

কেন কমছে না বিদ্যুতের দাম?

সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং কেন্দ্র দুটির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাম না কমানোর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দেখানো হয়েছে:

১। ঋণের সুদ ও কিস্তি: বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, লগ্নিকারী ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমাতে রাজি না হওয়ায় তারা বিদ্যুতের ট্যারিফ বা দাম কমাতে পারছে না। উল্লেখ্য, পায়রা কেন্দ্রে চীনের এক্সিম ব্যাংক ১৯৮ কোটি ডলার এবং রামপালে ভারতের এক্সিম ব্যাংক ১৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

২। চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে এই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) একতরফাভাবে পরিবর্তন করা আইনিভাবে অত্যন্ত কঠিন।

    পিডিবির লোকসানের বোঝা

    পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রকে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা করে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। পুরোদমে উৎপাদনে থাকলে একেকটি কেন্দ্রের মাসিক বিল দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রির ফলে পিডিবির আর্থিক অবস্থা শোচনীয়:

    • ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান: ১৭,০২১ কোটি টাকা (ভর্তুকি দেওয়ার পর নিট লোকসান)।
    • মোট ঘাটতি: প্রায় ৫৫,০০০ কোটি টাকা।
    • ভর্তুকি: সরকার থেকে ৩৮,৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও লোকসানের রেকর্ড গড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

    বিগত সরকারের আমলে এই কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেখিয়ে অনিয়ম করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, যার খেসারত এখন সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। একদিকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, অন্যদিকে চুক্তির বেড়াজালে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

    ট্যাগস :

    Write Your Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Save Your Email and Others Information

    আপলোডকারীর তথ্য

    Mahbub

    জনপ্রিয় সংবাদ

    লেবাননে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় ১১ ইসরাইলি সেনা আহত, আশঙ্কাজনক ৩

    কমছে না বিদ্যুতের দাম, পিডিবির লোকসান চরমে

    আপডেট সময় : ১২:৪২:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

    বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুই বৃহৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র—পায়রা ও রামপাল থেকে বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টা আপাতত সফল হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে দাম পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হলেও পায়রা কেন্দ্রের অংশীদার চীনের সিএমসি এবং রামপাল কেন্দ্রের অংশীদার ভারতের এনটিপিসি তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) আগের মতোই উচ্চমূল্যে এই দুই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।

    পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ীর দামের তুলনা

    পিডিবি বর্তমানে সরকারি কেন্দ্র মাতারবাড়ী থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে, তার তুলনায় পায়রা ও রামপালের দাম অনেক বেশি। নিচের সারণিতে এর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

    বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামউৎপাদন ক্ষমতাপ্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামমালিকানা/অংশীদার
    মাতারবাড়ী১২০০ মেগাওয়াট৮.৪৫ টাকাসরকারি (সিপিজিসিবিএল)
    পায়রা১৩২০ মেগাওয়াট১২.০০ টাকাবাংলাদেশ-চীন (বিসিপিসিএল)
    রামপাল১৩২০ মেগাওয়াট১৩.৫৭ টাকাবাংলাদেশ-ভারত (বিআইএফপিসিএল)

    কেন কমছে না বিদ্যুতের দাম?

    সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং কেন্দ্র দুটির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাম না কমানোর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দেখানো হয়েছে:

    ১। ঋণের সুদ ও কিস্তি: বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, লগ্নিকারী ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমাতে রাজি না হওয়ায় তারা বিদ্যুতের ট্যারিফ বা দাম কমাতে পারছে না। উল্লেখ্য, পায়রা কেন্দ্রে চীনের এক্সিম ব্যাংক ১৯৮ কোটি ডলার এবং রামপালে ভারতের এক্সিম ব্যাংক ১৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

    ২। চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে এই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) একতরফাভাবে পরিবর্তন করা আইনিভাবে অত্যন্ত কঠিন।

      পিডিবির লোকসানের বোঝা

      পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রকে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা করে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। পুরোদমে উৎপাদনে থাকলে একেকটি কেন্দ্রের মাসিক বিল দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রির ফলে পিডিবির আর্থিক অবস্থা শোচনীয়:

      • ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান: ১৭,০২১ কোটি টাকা (ভর্তুকি দেওয়ার পর নিট লোকসান)।
      • মোট ঘাটতি: প্রায় ৫৫,০০০ কোটি টাকা।
      • ভর্তুকি: সরকার থেকে ৩৮,৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও লোকসানের রেকর্ড গড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

      বিগত সরকারের আমলে এই কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেখিয়ে অনিয়ম করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, যার খেসারত এখন সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে। একদিকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, অন্যদিকে চুক্তির বেড়াজালে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।