ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদ-নদীগুলোর পানির ন্যায্য ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক চ্যানেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে একাধিকবার চিঠি দিলেও দিল্লির পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি বুঝিয়ে দেওয়া এবং যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানানো হলেও ভারত তা এড়িয়ে চলছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও জেআরসি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে কারিগরি পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠকের পর থেকে ভারতের পক্ষ থেকে সব ধরনের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের দেশ হিসেবে ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি ‘কৌশলগত হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে অবৈধভাবে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে কৃত্রিম সংকটে ফেলা হচ্ছে, আবার বর্ষায় কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই বাঁধ খুলে দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী এই চুক্তির সময়সীমা আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। অথচ চুক্তি বলবৎ থাকাকালে ভারত আন্তর্জাতিক রীতি অমান্য করে ফারাক্কা পয়েন্টে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করেনি।
আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির তথ্যমতে, গঙ্গা অববাহিকায় ভারত অন্তত ৩৩টি বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফারাক্কা ব্যারেজ ছাড়াও উত্তর প্রদেশের কানপুরে গঙ্গার ওপর বাঁধ নির্মাণ এবং জঙ্গিপুরের ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী ও হুগলী নদীতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে গঙ্গা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা ছিল, তা থেকে দেশটি বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মতে, ভারতের এই ‘নতজানু’ নীতির বিপরীতে বাংলাদেশকে এখনই আন্তর্জাতিক ফোরামে গিয়ে ভারতের ‘পানি আগ্রাসনের’ বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।
তিস্তা নদীর চিত্র আরও ভয়াবহ। উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণ এই নদীতে শুষ্ক মৌসুমে এখন ২০০ কিউসেক পানিও পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি থাকার কথা ছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির অজুহাতে গত কয়েক দশক ধরে তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকলেও উজানে গজলডোবাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অসংখ্য কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে ভারত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, কুশিয়ারা নদী নিয়ে ২০২২ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও যান্ত্রিক কারণে নয়, বরং ভারতের বাধার কারণে বাংলাদেশ নিজস্ব পাম্পহাউস ব্যবহার করে সেচের পানি তুলতে পারছে না।
ভারতের এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল দ্রুত মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং লবনাক্ততা বেড়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, সরকার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে। একই সাথে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও ভারতের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করে বিশ্ব দরবারে বিষয়টি তোলা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
রিপোর্টারের নাম 





















