ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে ‘ইসলামিক শিফট’ দেখছে ওয়াশিংটন; জামায়াতের সাথে সম্পর্ক জোরদারে মার্কিন কূটনীতিকের আগ্রহ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। গত ২২ জানুয়ারি ‘দি ওয়াশিংটন পোস্ট’ (The Washington Post) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় কর্মরত একজন মার্কিন কূটনীতিক নারী সাংবাদিকদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জামায়াতকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দলটির সাথে ‘বন্ধুত্ব’ গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই সম্ভাব্য কৌশলগত পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের উদ্বেগকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ এখন ‘আরও বেশি ইসলামমুখী’ (Shifted Islamic) হয়ে উঠেছে এবং আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করতে পারে। অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, তারা জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের তাদের শো-তে আমন্ত্রণ জানাতে পারবেন কি না। ওই কূটনীতিকের ভাষায়, “আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।” যদিও ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এই বৈঠককে ‘রুটিন এবং অফ-দ্য রেকর্ড’ বলে বর্ণনা করেছে এবং দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না।

জামায়াতের এই উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পেছনে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে। দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াত নিজেকে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ ও ‘সুশাসনপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলেও তাদের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে ওয়াশিংটনের হাতে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, জামায়াত যদি শরিয়াহ আইন বা নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র আদর্শিকভাবে নয়, বরং কৌশলগত বাস্তববাদ থেকে জামায়াতের সাথে যোগাযোগ রাখছে।

এই নতুন মেরুকরণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম জামায়াত।” ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত পাকিস্তানঘেঁষা হওয়ায় তারা ক্ষমতায় এলে বা মূলধারায় শক্তিশালী হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে। এদিকে, বিএনপির ভেতরেও জামায়াতকে নিয়ে দোটানা রয়েছে; তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের আশা করলেও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ঐক্যের ডাক দিয়ে রেখেছেন। সব মিলিয়ে জামায়াতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো’ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামোতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্প-সাহিত্যচর্চা রাজনীতির ঊর্ধ্বে: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ‘ইসলামিক শিফট’ দেখছে ওয়াশিংটন; জামায়াতের সাথে সম্পর্ক জোরদারে মার্কিন কূটনীতিকের আগ্রহ

আপডেট সময় : ১২:১৭:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। গত ২২ জানুয়ারি ‘দি ওয়াশিংটন পোস্ট’ (The Washington Post) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় কর্মরত একজন মার্কিন কূটনীতিক নারী সাংবাদিকদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জামায়াতকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দলটির সাথে ‘বন্ধুত্ব’ গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই সম্ভাব্য কৌশলগত পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের উদ্বেগকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ এখন ‘আরও বেশি ইসলামমুখী’ (Shifted Islamic) হয়ে উঠেছে এবং আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করতে পারে। অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, তারা জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের তাদের শো-তে আমন্ত্রণ জানাতে পারবেন কি না। ওই কূটনীতিকের ভাষায়, “আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।” যদিও ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এই বৈঠককে ‘রুটিন এবং অফ-দ্য রেকর্ড’ বলে বর্ণনা করেছে এবং দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না।

জামায়াতের এই উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পেছনে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে। দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াত নিজেকে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ ও ‘সুশাসনপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলেও তাদের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে ওয়াশিংটনের হাতে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, জামায়াত যদি শরিয়াহ আইন বা নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র আদর্শিকভাবে নয়, বরং কৌশলগত বাস্তববাদ থেকে জামায়াতের সাথে যোগাযোগ রাখছে।

এই নতুন মেরুকরণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম জামায়াত।” ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত পাকিস্তানঘেঁষা হওয়ায় তারা ক্ষমতায় এলে বা মূলধারায় শক্তিশালী হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে। এদিকে, বিএনপির ভেতরেও জামায়াতকে নিয়ে দোটানা রয়েছে; তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের আশা করলেও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ঐক্যের ডাক দিয়ে রেখেছেন। সব মিলিয়ে জামায়াতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো’ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামোতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।