আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও অবনতি হওয়ায় দেশের নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভিসা ছাড়া কতটি দেশে ভ্রমণ করা যায়, তার ওপর ভিত্তি করে এই পাসপোর্ট সূচক নির্ধারিত হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত সর্বশেষ র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর শীর্ষস্থান অধিকার করেছে, যেখানে দেশটির নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই ১৯২টি দেশে যেতে পারেন। এর বিপরীতে, বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম, এবং বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই মাত্র ৩৭টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। এই ৩৭টি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং মাদাগাস্কার ছাড়া অন্য দেশগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি পরিচিতি নেই।
এক দশক পূর্বেও বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কর্মক্ষেত্রে হংকং সফরের জন্য ভিসার আবেদন করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও ভিসা পেতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লেগেছিল, যা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল। ভিসা প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা টিকিট কেনা এবং হোটেল বুকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও প্রভাব ফেলেছিল, যা শেষ মুহূর্তে ব্যয় বৃদ্ধিতে বাধ্য করেছিল।
সেই সময়ে, সিঙ্গাপুরের একজন সহকর্মী, যিনি আমার বিদেশ যাত্রায় হোটেল বুকিং এবং টিকিট কেনার দায়িত্বে ছিলেন, প্রায়শই ভিসার খবর জানতে চাইতেন। তার কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ভিসার নিশ্চয়তা প্রয়োজন ছিল। ভিসার জন্য অপেক্ষার সময়ে তিনি কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “আচ্ছা, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আপনি ভিসা ছাড়া মোট কতটি দেশে যেতে পারেন?” উত্তরে আমি বলেছিলাম, “একটি।” তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমি আরও যোগ করেছিলাম, “ভিসা ছাড়া ঠিক কতটি দেশে যেতে পারব তা জানি না, তবে দেশের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে চলছে, তাতে একদিন নিজ দেশে যাওয়ার জন্যও ভিসা নিতে হলেও আমি অবাক হব না।” আমার কথা শুনে তিনি হেসেছিলেন এবং আমাকে ‘মজার মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
আজ এক যুগ পর, সেই সিঙ্গাপুরের সহকর্মী এখনও আমার সহকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন, পদোন্নতি পেয়ে কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার হলেও। তিনি এখন আর পাসপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন করেন না, কারণ তিনি বুঝে গেছেন যে ভিসা ছাড়া আমার ভ্রমণ সীমিত। যদিও আমি সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে সহজেই টুরিস্ট ভিসা পেতে পারি, আমাকে প্রায়শই বিজনেস ভিসা নিতে হয়, যার জন্য অনেক বেশি কাগজপত্র এবং শর্ত পূরণ করতে হয়।
এই বিড়ম্বনা এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু ভিসা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটছে না। ইন্দোনেশিয়ার ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ৮০টিরও বেশি দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা পান। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই তালিকায় স্থান না পাওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক।
গত বছরের নভেম্বরে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার রাস্তায় হাঁটার সময় আমার ঢাকার রাস্তার কথা মনে পড়েছিল। সেখানকার মানুষের চেহারা এবং জীবনযাত্রা অনেকখানি আমাদের মতোই। ফিলিপাইন সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক সরবরাহে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ, যা তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি প্রধান উৎস। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ নাবিক ফিলিপাইন সরবরাহ করে এবং প্রায় দুই লক্ষাধিক ফিলিপিনো নাবিক নিয়মিত সমুদ্রে কর্মরত থাকেন।
স্বাস্থ্যখাতে নার্স এবং গৃহকর্মী সরবরাহের ক্ষেত্রেও ফিলিপাইনের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক উন্নত। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের র্যাঙ্কিংয়ে ফিলিপাইন ভারত, মেক্সিকো এবং চীনের পরেই চতুর্থ স্থানে রয়েছে। অথচ, পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংয়ে ৭৩তম স্থানে থাকা ফিলিপিনোরা ৬৪টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া, সেখানে অবৈধভাবে অবস্থান করা বা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে জীবন হারানোর মতো ঘটনা ফিলিপিনোদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও আমাদের মতোই, জিডিপি র্যাঙ্কিংয়ে তারা আমাদের থেকে মাত্র দুই ধাপ উপরে। জিডিপির এই সামান্য ব্যবধান সত্ত্বেও ফিলিপাইন যদি অন্যান্য সূচকে ভালো অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশের এই করুণ দশা কেন?
কেউই রাতারাতি দেশের অবস্থান শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করে না, এবং তা সম্ভবও নয়। তবে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান ধীরে ধীরে উন্নত করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিচে তুলে ধরা হলো:
সরকারের তদারকি: দেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে সরকারকে নিষ্ক্রিয় দর্শক না থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব মন্ত্রণালয় নাগরিকদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাথে জড়িত, তাদের নিয়ে একটি নিবিড় তদারকি সেল গঠন করা প্রয়োজন। এই সেল দক্ষ ও সৎ জনবল দিয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার পূর্বে সকল কাগজপত্র এই সেলে জমা দিতে হবে। সরকারের তদারকি সেল তখন বিদেশগামী ব্যক্তি, তাদের এজেন্ট, বিদেশের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সাথে যোগাযোগ করে নিয়োগের সত্যতা যাচাই করবে। রিক্রুটিং এজেন্টরা বিদেশগামী কর্মীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবে তার কতটুকু পূরণ হবে, তা যাচাই করার পরেই ভ্রমণের ছাড়পত্র দেওয়া উচিত। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করা কঠিন নয়। বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারের তদারকি থাকলেও, সুফল না আসায় এর ধরনে পরিবর্তন আনা আবশ্যক। যে কোনো পদ্ধতিতে তদারকি করা হোক না কেন, অবৈধ বিদেশ গমন প্রতিরোধ করতে হবে।
বিদেশ গমনেচ্ছুদের সতর্কীকরণ: অবৈধ পথে গিয়ে যারা লাশ হয়ে ফিরছেন, তারা কি বাস্তবতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ? এদের অনেকেই নিয়মিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন এবং বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে সে সম্পর্কে অবগত থাকেন। অনেক দেশের সরকার গঠনে অভিবাসন-বিরোধী নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই খবরগুলো কি তাদের কাছে পৌঁছায় না? নাকি লোভ এবং মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে তারা নিজেদের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন?
আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ: আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে অন্যান্য বিষয় আপনা-আপনিই সঠিক পথে চালিত হয়। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং। এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে প্রতারক মানব পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা যায়। শুধু প্লেনে তুলে দেওয়াই নয়, কর্মী বিদেশ গিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান না করা পর্যন্ত চুক্তির কিছু অংশ (যেমন ১০%) আটকে রাখা যেতে পারে। সেখানে গিয়ে স্থিতিশীল হওয়ার পর কর্মীর মতামতের ভিত্তিতে বাকি পাওনা পরিশোধ করা হবে। কর্মীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আইনে এমন অনেক শর্ত যুক্ত করা প্রয়োজন।
গত ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে নজর দেবে এবং প্রতারক ব্যবসায়ীদের শায়েস্তা করতে শুদ্ধি অভিযান চালাবে বলে আশা করেছিলাম। অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াটা হতাশাজনক।
প্রবাসী আয়ের ওপর দেশের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। এই খাতে শুদ্ধি অভিযান চালালে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় সরকার কি হাত গুটিয়ে বসে আছে? প্রবাসী আয়ের সিংহভাগই বৈধ প্রবাসীদের মাধ্যমে আসে। অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়াকে কঠিন করে তুলতে পারলে বিশ্বজুড়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং পাসপোর্টের র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি ঘটবে। বৈধ পথে আরও অনেক দেশে কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে এবং আরও বেশি আয় আসবে। ভারত, মেক্সিকো, চীন এবং ফিলিপাইন এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা কম। তবে, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। পূর্ববর্তী সরকার তার দীর্ঘ শাসনামলে কেবল নিজের অনুগত কিছু মানুষ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের পাসপোর্টের মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছিল; সাধারণ জনগণ এবং সবুজ পাসপোর্ট ছিল উপেক্ষিত। এই পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, এবার যেন জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়—এটাই প্রত্যাশা।
রিপোর্টারের নাম 

























