ঢাকা ১০:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

সংরক্ষণের অভাবে বিলীন হচ্ছে নবাবগঞ্জের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩১:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এই অঞ্চলের গৌরবময় ইতিহাস। স্থানীয়দের মতে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য ঢিবি ও স্থাপনা খনন করলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রাচীন জনপদের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না থাকায় এসব অমূল্য সম্পদ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

নবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার ও মুনির থান, মাহমুদপুর ইউনিয়নের দরিয়ায় অরুণধাপ বা বেহুলার বাপের বাড়ির ঢিবি, বেহুলার বাসরঘর ঢিবি, হরিনাথপুর দুর্গ এবং হলাইজানা তেলিপাড়া মসজিদ। এ ছাড়া দাউদপুর ইউনিয়নের জিগাগড় দুর্গ, পুটিমারা ইউনিয়নের টঙ্গী ঢিবি ও দলার দরগা মঠ এবং ভাদুরিয়া ইউনিয়নের নিশা পলাশবাড়ী মঠ ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সংস্কারের অভাবে এসব স্থাপনার বেশিরভাগই এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে।

দিনাজপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বিশিষ্ট গবেষক আবুল কালাম যাকারিয়ার মতে, এই সমগ্র অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে একাধিক বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব রয়েছে। গবেষক আব্দুল আজিজের ‘নবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে প্রত্নসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, উপজেলার মাহমুদপুর এলাকায় ১৯৬০ সালের আগে প্রায় ১০০টি প্রাচীন ঢিবি ছিল। ১৯৬৭ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫১টিতে। বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও সংকুচিত হয়ে বহু ঢিবি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে পরীক্ষামূলক খনন চালিয়ে বগুড়ার মহাস্থানগড় ও লখিন্দরের মেড়ের সদৃশ একটি পুরাকীর্তির সন্ধান পায়। বর্তমানে সেখানে নামমাত্র একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দাউদপুর ইউনিয়নের খয়েরগনি এলাকায় খনন কাজ চালিয়ে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে সেই প্রকল্পের কাজ আর এগোয়নি। ফলে মহামূল্যবান সেই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি আবারও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নবাবগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঢিবিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে একদিকে যেমন নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে, অন্যদিকে এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই অমূল্য সাক্ষীগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসা ৪ বাংলাদেশি বর্ণনা দিলেন সেই মিসাইল হামলার

সংরক্ষণের অভাবে বিলীন হচ্ছে নবাবগঞ্জের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

আপডেট সময় : ১০:৩১:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এই অঞ্চলের গৌরবময় ইতিহাস। স্থানীয়দের মতে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য ঢিবি ও স্থাপনা খনন করলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রাচীন জনপদের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না থাকায় এসব অমূল্য সম্পদ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

নবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার ও মুনির থান, মাহমুদপুর ইউনিয়নের দরিয়ায় অরুণধাপ বা বেহুলার বাপের বাড়ির ঢিবি, বেহুলার বাসরঘর ঢিবি, হরিনাথপুর দুর্গ এবং হলাইজানা তেলিপাড়া মসজিদ। এ ছাড়া দাউদপুর ইউনিয়নের জিগাগড় দুর্গ, পুটিমারা ইউনিয়নের টঙ্গী ঢিবি ও দলার দরগা মঠ এবং ভাদুরিয়া ইউনিয়নের নিশা পলাশবাড়ী মঠ ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সংস্কারের অভাবে এসব স্থাপনার বেশিরভাগই এখন ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে।

দিনাজপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বিশিষ্ট গবেষক আবুল কালাম যাকারিয়ার মতে, এই সমগ্র অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে একাধিক বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব রয়েছে। গবেষক আব্দুল আজিজের ‘নবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে প্রত্নসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, উপজেলার মাহমুদপুর এলাকায় ১৯৬০ সালের আগে প্রায় ১০০টি প্রাচীন ঢিবি ছিল। ১৯৬৭ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫১টিতে। বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও সংকুচিত হয়ে বহু ঢিবি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে পরীক্ষামূলক খনন চালিয়ে বগুড়ার মহাস্থানগড় ও লখিন্দরের মেড়ের সদৃশ একটি পুরাকীর্তির সন্ধান পায়। বর্তমানে সেখানে নামমাত্র একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দাউদপুর ইউনিয়নের খয়েরগনি এলাকায় খনন কাজ চালিয়ে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে সেই প্রকল্পের কাজ আর এগোয়নি। ফলে মহামূল্যবান সেই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি আবারও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নবাবগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঢিবিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে একদিকে যেমন নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে, অন্যদিকে এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই অমূল্য সাক্ষীগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।