চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তীব্র চিকিৎসক সংকটে জর্জরিত। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, চিকিৎসক স্বল্পতার কারণে এলাকার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরতরা। বিশেষ করে, গত ১৪ বছর ধরে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ থাকায় প্রসূতি মায়েরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বসবাস। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র চারজন চিকিৎসক রয়েছেন। তারা হলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার, আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং একজন সহকারী সার্জন। এই অপর্যাপ্ত জনবল দিয়ে পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারী), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া), মেডিকেল অফিসার (ইউএইচসি) ডেন্টাল, সহকারী সার্জন সহ আরও একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এছাড়াও, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জন নেই।
২০০৮ সালে নির্মিত ৩১ শয্যাবিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরবর্তীতে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সকল অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলেও, কাঙ্ক্ষিত জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এর পূর্ণাঙ্গ সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। সূত্রমতে, একজন গাইনি চিকিৎসক থাকলেও তিনি বর্তমানে ডেপুটেশনে অন্য কোথাও কর্মরত আছেন।
হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি সচল থাকলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, ফলে এলাকাবাসী এই অত্যাবশ্যকীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ল্যাবেও পর্যাপ্ত সংখ্যক টেকনিশিয়ান না থাকায় নমুনা পরীক্ষা ও রিপোর্ট প্রদানে বিলম্ব হচ্ছে।
পূর্বের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তাছলিমা আফরোজ অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। এছাড়াও, বিগত ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) পদে কোনো চিকিৎসক না থাকায় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে, প্রসূতি মায়েরা বাধ্য হয়ে অধিক ব্যয় ও ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার ছয়টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে তিনজন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন (ডা. কামরুজ্জামান ও ডা. সাবিয়া জাহান) প্রেষণে রয়েছেন। ডা. কামরুজ্জামান ২০১৯ সাল থেকে এবং ডা. সাবিয়া জাহান ২০২২ সাল থেকে প্রেষণে কাজ করছেন। একই সময়ে, ডা. রাশেদুল হাসান ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বিনা কারণে অনুপস্থিত রয়েছেন।
এসব পদায়ন ও প্রেষণের কারণে অনেক চিকিৎসক মূল কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, যার ফলে মতলব উত্তরের সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তাদের চাঁদপুর বা ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রসূতি মায়েরা যেখানে জীবন বাঁচানোর জন্য দাইয়ের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয় এই সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে ১৪ বছরই এখানে গাইনি চিকিৎসক ও অ্যানেসথেসিয়া পরিষেবা বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, “৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়া সত্ত্বেও আমরা প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছি না। জনবল সংকটের কারণে সেবা প্রদানে আমরা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের অত্যাধুনিক ল্যাব ও এক্স-রে মেশিন থাকা সত্ত্বেও টেকনিশিয়ান ও লোকবলের অভাবে সেগুলো অকার্যকর থাকছে। অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত থাকলেও গাইনি চিকিৎসকের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল পেলে আমরা এই এলাকার মানুষের জন্য আরো উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারব।”
রিপোর্টারের নাম 























