ঢাকা ১০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

ক্রিকেটের রাজনীতিকীকরণ: আঞ্চলিক এজেন্ডা পূরণে ভারতের একতরফা আধিপত্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ক্রিকেট আজ এক কঠিন সময়ের সম্মুখীন। খেলাটির পরিচালন সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) উপর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) একচ্ছত্র আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ক্রিকেটকে ব্যবহার করার প্রবণতা খেলাটির নিরপেক্ষতা ও ঐতিহ্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের নিয়োগ এই আধিপত্যকে আরও দৃঢ় করেছে, যা খেলাটির অভিভাবক সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলস্বরূপ, ক্রিকেট তার হারানো জৌলুস এবং স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধারের জন্য এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে।

আইসিসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রায়শই একতরফা এবং ভারতীয় স্বার্থের অনুকূলে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যদি একই ধরনের পরিস্থিতি ভারত বা ‘বিগ থ্রি’র অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ঘটত, তবে সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতো—যা অতীতের বহু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিসিবির অবস্থান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ‘প্রাণ দেব, মান নয়’—এই নীতি অবলম্বন করে, অন্যায়কে প্রতিহত করার যে দৃঢ়তা বিসিবি দেখিয়েছে, তা সত্যিই বিরল।

ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতের উত্থাপিত নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে। অথচ, বাংলাদেশও ভারতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগে ভুগছে। আইসিসি প্রথমে এই নিরাপত্তাকে মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির বলে উল্লেখ করলেও, পরবর্তীতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করে, যা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এমসিজিতে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে আম্পায়ারিং-এর একাধিক ভুল বাংলাদেশের বিপক্ষে গিয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য এমসিজির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল, যা স্পষ্টতই ভারতের অনুকূলে সাজানো হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ম্যাচ শেষে বাংলাদেশি দর্শকদের প্রতি ভারতীয় দর্শকদের আচরণ ছিল আপত্তিকর, যা শেষ পর্যন্ত অনেক ভারতীয় সমর্থককে স্ট্যান্ড থেকে বের করে দিতে বাধ্য করে। বিদেশের মাটিতে যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তবে নিজ দেশে তা কতটা আক্রমণাত্মক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

গত ২০২৩ বিশ্বকাপের সময় শোয়েব আলীর খেলনা বাঘ ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাটিও এই অন্যায়ের আরেকটি উদাহরণ। বিসিবির বর্তমান পদক্ষেপ হয়তো বৈশ্বিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু এটি ভবিষ্যতে ন্যায্যতা ও খেলাটির সততা রক্ষায় অন্যান্য দেশকে একত্রিত হওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।

আইসিসি যদি ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশ এবং তাদের বাজার থেকে আসা বিপুল রাজস্বকে উপেক্ষা করে, তবে তা খেলাটির জন্যই ক্ষতিকর হবে। বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে তেমন কিছু হারাচ্ছে না। এই সমস্ত ঘটনার মূল কারণ হল ভারত কর্তৃক নিজেদের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার প্রয়াস, যা দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করার বীজ বপন করেছে।

এই সংকটের পেছনে একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় আরও সচেষ্ট হয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশকে একটি অধীনস্থ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে, যা সার্বভৌম রাষ্ট্রকে উপনিবেশের মতো দেখার সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিফলন। এই অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে ভারতের সময় লাগবে।

বর্তমানে, এই পরিস্থিতির দায়ভার ভারতের ওপর। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিহাসের এক নতুন নিম্নবিন্দুতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান। আশা করা যায়, ভারত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সম্মান জানাবে এবং শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ভারত যদি এক ধাপ এগিয়ে আসে, বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে যাবে।

ক্রিকেট হয়তো ভারতের ধর্ম, কিন্তু বাংলাদেশের আবেগ। কারো এই আবেগকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা উচিত নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা: আট মাসে আয় কমেছে ৩.১৫ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতির অবনতি

ক্রিকেটের রাজনীতিকীকরণ: আঞ্চলিক এজেন্ডা পূরণে ভারতের একতরফা আধিপত্য

আপডেট সময় : ০৯:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

ক্রিকেট আজ এক কঠিন সময়ের সম্মুখীন। খেলাটির পরিচালন সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) উপর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) একচ্ছত্র আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ক্রিকেটকে ব্যবহার করার প্রবণতা খেলাটির নিরপেক্ষতা ও ঐতিহ্যকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের নিয়োগ এই আধিপত্যকে আরও দৃঢ় করেছে, যা খেলাটির অভিভাবক সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলস্বরূপ, ক্রিকেট তার হারানো জৌলুস এবং স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধারের জন্য এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে।

আইসিসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রায়শই একতরফা এবং ভারতীয় স্বার্থের অনুকূলে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যদি একই ধরনের পরিস্থিতি ভারত বা ‘বিগ থ্রি’র অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ঘটত, তবে সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতো—যা অতীতের বহু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিসিবির অবস্থান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ‘প্রাণ দেব, মান নয়’—এই নীতি অবলম্বন করে, অন্যায়কে প্রতিহত করার যে দৃঢ়তা বিসিবি দেখিয়েছে, তা সত্যিই বিরল।

ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতের উত্থাপিত নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে। অথচ, বাংলাদেশও ভারতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগে ভুগছে। আইসিসি প্রথমে এই নিরাপত্তাকে মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির বলে উল্লেখ করলেও, পরবর্তীতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করে, যা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এমসিজিতে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে আম্পায়ারিং-এর একাধিক ভুল বাংলাদেশের বিপক্ষে গিয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য এমসিজির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল, যা স্পষ্টতই ভারতের অনুকূলে সাজানো হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ম্যাচ শেষে বাংলাদেশি দর্শকদের প্রতি ভারতীয় দর্শকদের আচরণ ছিল আপত্তিকর, যা শেষ পর্যন্ত অনেক ভারতীয় সমর্থককে স্ট্যান্ড থেকে বের করে দিতে বাধ্য করে। বিদেশের মাটিতে যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তবে নিজ দেশে তা কতটা আক্রমণাত্মক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

গত ২০২৩ বিশ্বকাপের সময় শোয়েব আলীর খেলনা বাঘ ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাটিও এই অন্যায়ের আরেকটি উদাহরণ। বিসিবির বর্তমান পদক্ষেপ হয়তো বৈশ্বিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু এটি ভবিষ্যতে ন্যায্যতা ও খেলাটির সততা রক্ষায় অন্যান্য দেশকে একত্রিত হওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।

আইসিসি যদি ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশ এবং তাদের বাজার থেকে আসা বিপুল রাজস্বকে উপেক্ষা করে, তবে তা খেলাটির জন্যই ক্ষতিকর হবে। বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে তেমন কিছু হারাচ্ছে না। এই সমস্ত ঘটনার মূল কারণ হল ভারত কর্তৃক নিজেদের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার প্রয়াস, যা দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করার বীজ বপন করেছে।

এই সংকটের পেছনে একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় আরও সচেষ্ট হয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশকে একটি অধীনস্থ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে, যা সার্বভৌম রাষ্ট্রকে উপনিবেশের মতো দেখার সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিফলন। এই অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে ভারতের সময় লাগবে।

বর্তমানে, এই পরিস্থিতির দায়ভার ভারতের ওপর। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিহাসের এক নতুন নিম্নবিন্দুতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান। আশা করা যায়, ভারত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সম্মান জানাবে এবং শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ভারত যদি এক ধাপ এগিয়ে আসে, বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে যাবে।

ক্রিকেট হয়তো ভারতের ধর্ম, কিন্তু বাংলাদেশের আবেগ। কারো এই আবেগকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা উচিত নয়।