ঢাকা ১২:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমল ৮৭ হাজার কোটি টাকা: নেপথ্যে গণহারে পুনঃতফসিল ও নীতি সহায়তা

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় কিছুটা কমেছে। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংকগুলো তাদের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন ইতিবাচক দেখাতে ঋণ আদায়ে বাড়তি তৎপরতা চালায়। তবে এবারের বড় হ্রাসের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে জাতীয় নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ নীতি সহায়তা। এই সুবিধার আওতায় বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যার ফলে কাগজে-কলমে খেলাপির তালিকা থেকে বড় একটি অংশ বেরিয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই সময়ে ব্যাংকগুলো প্রায় ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করেছে।

উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য দীর্ঘ সময় আড়ালে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে আনেন। এতে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।

পরবর্তীতে এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন শিথিল নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত পরিশোধের সময়সীমা এবং শুরুতে দুই বছরের কিস্তি পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড) সুবিধা রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় ১ হাজার ৫১৬টি আবেদনের মাধ্যমে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব আসে। এর মধ্যে বড় বড় শিল্প গ্রুপের ৯০০টি আবেদন নিস্পত্তি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২৫০টি আবেদন কার্যকর করার মাধ্যমে ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না, যদি না প্রকৃত আদায় বৃদ্ধি পায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারের আকাশসীমায় ইরানের আগ্রাসন প্রতিহত: দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমল ৮৭ হাজার কোটি টাকা: নেপথ্যে গণহারে পুনঃতফসিল ও নীতি সহায়তা

আপডেট সময় : ১০:২৪:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় কিছুটা কমেছে। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংকগুলো তাদের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন ইতিবাচক দেখাতে ঋণ আদায়ে বাড়তি তৎপরতা চালায়। তবে এবারের বড় হ্রাসের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে জাতীয় নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ নীতি সহায়তা। এই সুবিধার আওতায় বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যার ফলে কাগজে-কলমে খেলাপির তালিকা থেকে বড় একটি অংশ বেরিয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই সময়ে ব্যাংকগুলো প্রায় ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করেছে।

উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য দীর্ঘ সময় আড়ালে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে আনেন। এতে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।

পরবর্তীতে এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন শিথিল নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত পরিশোধের সময়সীমা এবং শুরুতে দুই বছরের কিস্তি পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড) সুবিধা রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় ১ হাজার ৫১৬টি আবেদনের মাধ্যমে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব আসে। এর মধ্যে বড় বড় শিল্প গ্রুপের ৯০০টি আবেদন নিস্পত্তি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২৫০টি আবেদন কার্যকর করার মাধ্যমে ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না, যদি না প্রকৃত আদায় বৃদ্ধি পায়।