ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম দেশজুড়ে ব্যাপক গতি পেয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর থেকেই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, দল মনোনীত প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের প্রতীকে ভোট চাইছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রত্যাশিত এই নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই জমজমাট প্রচারণার মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কয়েকটি স্থানে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচার কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশেই কেটে গেছে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলমান বাগ্যুদ্ধ নির্বাচনী মাঠের স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে এ বাগ্যুদ্ধ যেন সংঘাতের দিকে না গড়ায়, সে বিষয়ে সবার সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা নয় ঘণ্টা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন। তবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা যাবে না। এবারই প্রথমবারের মতো প্রার্থীরা নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার করতে পারছেন না। জনসভা বা সমাবেশের ক্ষেত্রে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না।
শীর্ষ নেতাদের প্রচারণার চিত্র:
আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা মাঠে নেমেছেন।
বিএনপির প্রচারণা:
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের ঐতিহ্য অনুসরণ করে সিলেট থেকে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। প্রথম দিন তিনি সাতটি জেলায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। বুধবার রাতে সিলেট পৌঁছে তিনি হযরত শাহজালাল (র.) ও শাহ পরান (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। বৃহস্পতিবার সকালে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং দুপুর সাড়ে ১২টায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। সড়কপথে সিলেট থেকে যাত্রা করে তিনি একে একে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদীর পৌরপার্ক এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। নারায়ণগঞ্জের জনসভায় তিনি যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন সময় ছিল রাত পৌনে চারটা। টানা ১৬ ঘণ্টার নির্বাচনী কর্মসূচি সম্পন্ন করে তারেক রহমান গতকাল ভোরে ঢাকা ফেরেন। প্রথম দিনের টানা কর্মসূচিতে তাকে ক্যাজুয়াল পোশাকে দেখা যায়।
আজ তারেক রহমান চট্টগ্রাম যাচ্ছেন। আজ রাতে সেখানে অবস্থান করে সাড়ে নয়টায় তরুণদের সঙ্গে ‘পলিসি ডায়ালগ’-এ মতবিনিময় সভা করবেন। এরপর বেলা ১১টায় শহরের পলোগ্রাউন্ড ময়দানে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন। সড়কপথে ঢাকার পথে তিনি ফেনীর পাইলট কলেজ ময়দান, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, সুয়াগাজী, দাউদকান্দি এবং নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বালুর মাঠে সমাবেশ করবেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফেরার পর নিজ নির্বাচনী এলাকা বগুড়াসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় সফর করার কথা রয়েছে তার।
জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণা:
এদিকে, প্রচার শুরুর প্রথম দিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের মিরপুরের আদর্শ স্কুল মাঠে জনসভার মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মসূচির যাত্রা শুরু করেন। ওই জনসভায় ১০ দলীয় জোটের শরিক এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শরিক দলের একাধিক নেতা বক্তব্য দেন।
গতকাল ফজরের নামাজের পরপরই নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। প্রচারের দ্বিতীয় দিন দলটির আমির দুদিনের সফরে উত্তরবঙ্গ গেছেন। গতকাল বেলা ১১টায় পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে ১০ দলীয় জোট আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ঢাকার বাইরের নির্বাচনী জনসভা শুরু করেন। একই দিন পর্যায়ক্রমে তিনি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। উত্তরবঙ্গ সফরের দ্বিতীয় দিন আজ সকালে তিনি রংপুরে জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন। পরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, বগুড়া শহর, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ শহর, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও পাবনায় আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিয়ে রাতেই ঢাকা ফিরবেন। এরপর তিনি দেশের অন্যান্য অঞ্চল সফর করবেন বলে জানা গেছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য:
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রথম দুদিনের নির্বাচনী জনসভায় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি একে অপরকে ঘায়েল করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। দুই দলের নেতারাই একে অপরের নাম উল্লেখ না করে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যে পরোক্ষভাবে ধর্মের বিষয়টিও উঠে এসেছে। উঠে এসেছে স্বাধীনতাযুদ্ধসহ সাড়ে ১৫ বছরের ভূমিকাও।
তারেক রহমান তার সিলেট সফরের বক্তব্যে বলেছেন, “জান্নাতের টিকিট বিতরণ করে একটি দল শিরক করছে। শিরক আল্লাহ কোনোভাবেই পছন্দ করেন না। শিরক করলে তার ক্ষমা নেই।” জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তার নির্বাচনী এলাকা খুলনার একটি জনসভায় বলেছেন, “লন্ডন থেকে ১৭ বছর পর একজন মুফতি আবির্ভূত হয়েছেন।”
অন্যান্য দলের প্রচারণা:
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার সমাধি ও শহীদ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে এনসিপি এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিতার কবর জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন।
গতকাল রাজধানীর ডেমরায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। এর আগে বৃহস্পতিবার তার ভাই ও দলের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বরিশাল শহর থেকে (নিজ নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-৫) আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন।
এদিকে রাজনৈতিক দলের বাইরেও বেশ কয়েকজন আলোচিত দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যাপক প্রচার শুরু করেছেন। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা বিভিন্ন কৌশলে ভোট চাইছেন। নির্বাচনী এলাকার জনগণের জন্য বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। কোনো কোনো প্রার্থী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। গোপালগঞ্জে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন:
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “এককথায় বলব নির্বাচনী প্রচারে ধুম পড়েছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মাঝে বড় ধরনের উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট নিয়ে যে সংশয়ের কথা শুনে আসছি, প্রচার শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে গেছে। দল ও প্রার্থীরা যেভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করছে, তাতে নির্বাচনটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়।”
বিভিন্ন দলের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে তিনি কাদা ছোড়াছুড়ি হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, “প্রতিটি দল বা জোট ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ লালন করে। এক্ষেত্রে তারা একে অপরের যে সমালোচনা করছে, সেটা তাদের মতাদর্শ প্রকাশেরই অংশ। এটা না হলে তারা কীভাবে তাদের আদর্শ প্রচার করবে? আমরা একে অপরের গঠনমূলক সমালোচনা চাই। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, সমালোচনা যেন সংঘাতে রূপ না নেয়।”
জমজমাট প্রচার কার্যক্রমকে ইতিবাচক উল্লেখ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল বলেন, “সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান জোটের নেতারা উদ্যম ও উচ্ছ্বাসে ভরা প্রচার শুরু করেছেন। আসন্ন নির্বাচনের জন্য এটা তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক দিক।” তিনি আশা করেন, “দুয়েকটি নির্বাচনী অনিয়ম ও সহিংসতার খবর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই থাকবে। এর আকার ব্যাপক হবে না। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ন্যায্য পদক্ষেপ নেবে এবং ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠ সহিংসতামুক্ত ও লেভেল প্লেয়িং থাকবে।”
নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে যে শঙ্কা প্রকাশের খবর পাওয়া গিয়েছিল, উৎসবমুখর প্রচারে তা কেটেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষক বলেন, “বিভিন্ন টকশোতে আসন্ন নির্বাচনের ‘অনিশ্চয়তা’ বিষয়ক ধারণা-আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের ‘মতপ্রকাশের অধিকার’ হিসেবে দেখাই ভালো মনে করি। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের প্রচারের কোনোটিই ‘নির্বাচনের বিকল্প কিছু বিবেচনায় রাখে’ বলে এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তাই আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ জানানোই ‘যৌক্তিক’ মনে করি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “যেভাবে প্রচারের শুরুটা দেখা যাচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশাটাও এমন ছিল। প্রচার শুরুর পর একটি নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। আশা করছি এ ধারাবাহিকতায় ভোটও উৎসবমুখর হবে।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক বক্তব্যে কাদা ছোড়াছুটির বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখতে চাই না। এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোর অলংকার হিসেবে দেখতে চাই। তবে আশা করব, এটা যেন সুস্থ ধারায় চলে। এটা অসুস্থ ধারার চলে গেলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।”
গণভোটের প্রচারণা উপেক্ষিত:
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারে গণভোটের বিষয় উপেক্ষিত হচ্ছে—এমনটা উল্লেখ করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এটা খুবই হতাশাজনক। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটা কাম্য নয়। যেসব দলকে আমরা গণভোটের বিষয়ে সিরিয়াস দেখেছিলাম, তাদের মধ্যেও গণভোটের প্রচার দেখা যাচ্ছে না। তারা গণভোটের চেয়ে দলীয় প্রতীকের পক্ষেই ভোটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।” রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের বিষয়ে নীরব থাকলে তরুণ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেবে বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
রিপোর্টারের নাম 






















