দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চরম হাহাকার ও মূল্যের অস্থিতিশীলতা কাটাতে প্রথমবারের মতো সরাসরি গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। মূলত বেসরকারি খাতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই বাজারে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কৃত্রিম সংকট নিরসনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিপিসি কেবল ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে উৎপাদিত সামান্য পরিমাণ (চাহিদার মাত্র ১.৩ শতাংশ) এলপিজি সরবরাহ করে, যা বাজারের তুলনায় নগণ্য।
আমদানির অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘সরকার টু সরকার’ (জিটুজি) পদ্ধতিতে এলপিজি আমদানি করা হবে এবং আমদানিকৃত গ্যাস বেসরকারি অপারেটরদের স্টোরেজ ও বটলিং সুবিধা ব্যবহার করে বাজারে সরবরাহ করা হবে। বিপিসির নিজস্ব কোনো জেটি বা স্টোরেজ ব্যবস্থা না থাকায় তারা লজিস্টিক সহায়তার জন্য বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করবে।

সংকটের নেপথ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ডলার সংকট:
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত অক্টোবর মাসে ইরানের তেল ও এলপিজি খাতের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় জাহাজ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম এলপিজি সরবরাহকারী দেশ ইরান থেকে পণ্য আনতে না পারায় আমদানিতে বিঘ্ন ঘটেছে। এছাড়া দেশে এলসি (ঋণপত্র) খোলার জটিলতার কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো গ্যাস আমদানি করতে পারেনি। শীত মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট কারসাজিতে ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিপিসির পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ:
বিপিসি জানিয়েছে, তারা লোয়াব (LPG Operators Association of Bangladesh) সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। আগ্রহী অপারেটররা বিপিসিকে অগ্রিম টাকা প্রদান করলে বিপিসি জিটুজি পদ্ধতিতে এলসি খুলবে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিজস্ব জেটি বা পাইপলাইন না থাকায় কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস খালাস করতে হবে, যা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে এলপিজি আমদানির জন্য লাইসেন্স সংশোধন করার প্রক্রিয়াটিও বাকি রয়েছে।
| এলপিজি আমদানির তথ্য চিত্র | ২০২৪ (ডিসেম্বর) | ২০২৫ (ডিসেম্বর) |
| আমদানির পরিমাণ (টন) | ১,২৬,০৬২ | ১,৪১,৭৬৫ |
| বিইআরসি নির্ধারিত দাম (১২ কেজি) | ১,২৫৩ টাকা | ১,৩০৬ টাকা |
| আমদানির ঘাটতি (গত বছরের তুলনায়) | – | ১৮,৮৬৬ টন |
ব্যবসায়ীরা বিপিসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এটি স্থায়ী সমাধান কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বিপিসি যদি আন্তর্জাতিক বাজার দরের চেয়ে কম মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই মডেল কার্যকর হবে না। এদিকে লোয়াব সভাপতি জানিয়েছেন, আগ্রহী বড় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত আমদানির অনুমতি দিলে এই সংকট তৈরি হতো না। বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা এলপিজিবাহী জাহাজগুলো দেশে পৌঁছালে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























