বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘কোচিং সংস্কৃতি’ আজ এক অনস্বীকার্য ও জটিল বাস্তবতা। একসময় যা ছিল কেবল পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তার মাধ্যম, আজ তা একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষণা—“দেশের শতভাগ কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে হবে”—এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোচিং কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থার কোনো রোগ, নাকি এটি মূল কাঠামোর দুর্বলতার একটি অনিবার্য উপসর্গ?
কোচিং সংস্কৃতির উত্থান: কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন
কোচিং সংস্কৃতির এই রমরমা অবস্থার পেছনে রয়েছে একাধিক গভীর কারণ। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, জনাকীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং পাঠদানের নিম্নমানের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে পুরোপুরি শিখতে পারে না। এই ঘাটতি পূরণের জন্যই তারা কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের দ্বারস্থ হয়। তবে সমস্যা তখন শুরু হয়, যখন এই ‘সহায়ক ব্যবস্থা’ মূল ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীই শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিংয়ের পড়া বা মডেল টেস্টকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা স্কুল-কলেজের গুরুত্বকে ক্রমেই ম্লান করে দিচ্ছে।
বাণিজ্যিকীকরণ ও সামাজিক বৈষম্য
শিক্ষাকে আজ এক প্রকার পণ্যে পরিণত করেছে কোচিং সেন্টারগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ। গ্যারান্টি দিয়ে ভালো ফলের আশ্বাস আর চটকদার বিজ্ঞাপনে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে গভীর সামাজিক বৈষম্য। সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানরা নামি কোচিংয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি এক বিশাল আর্থিক বোঝা। তদুপরি, মুখস্থনির্ভর কোচিং পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাকেও সংকুচিত করে দিচ্ছে।
শহর ও গ্রামের ভিন্ন চিত্র
কোচিং নির্ভরতার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক স্পষ্ট বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়:
- শহর: এখানে কোচিং একটি ‘অতিনির্ভরতা’ ও আভিজাত্যের প্রতীক। শিক্ষার্থীদের জীবন স্কুল ও কোচিংয়ের রুটিনে বন্দি।
- গ্রাম: গ্রামাঞ্চলে কোচিং মূলত ‘সুযোগের অভাব’ বা আক্ষেপের নাম। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলেও মানসম্মত শিক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীরা দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা পর্যায়েও এই সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার ঘটছে।
সমাধানের পথ: মূল কাঠামোর সংস্কার
কোচিংয়ের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হলে কেবল আইন দিয়ে বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষার মূল কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে।
১. স্কুলভিত্তিক শিক্ষার মানোন্নয়ন: শ্রেণিকক্ষেই যদি মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত হয়, তবে কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই কমে আসবে।
২. মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন: পরীক্ষানির্ভর মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন চালু করা জরুরি।
৩. সরকারি নীতিমালা: শিক্ষকদের কোচিংয়ে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা এবং কোচিং সেন্টারের নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. মানসিকতার পরিবর্তন: অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, অতিরিক্ত কোচিং সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকেই। কোচিংকে থাকতে হবে কেবল একটি ঐচ্ছিক সহায়ক হিসেবে, বিকল্প হিসেবে নয়। অন্যথায়, কোচিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই শিক্ষাব্যবস্থা যেকোনো সময় ভারসাম্য হারিয়ে ধসে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























