ঢাকা ০১:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

ইরান যুদ্ধের আগুনে এশিয়ার অর্থনীতি: হাজার কোটি ডলারের মহাক্ষতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই যুদ্ধের ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি হাজার হাজার কোটি ডলারের লোকসানের মুখে পড়তে পারে, যা লাখ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

আর্থিক ক্ষতির সম্ভাব্য চিত্র

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যে আর্থিক আঘাত আসবে তার প্রধান দিকগুলো হলো:

  • বিপুল আর্থিক লোকসান: এ অঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯ হাজার ৭০০ কোটি থেকে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে, যা আঞ্চলিক জিডিপির প্রায় ০.৩% থেকে ০.৮%।
  • দারিদ্র্যের বিস্তার: বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়বে, যার মধ্যে শুধু এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই থাকবে ৮৮ লাখ মানুষ।
  • ব্যয় বৃদ্ধি: পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য এই ক্ষতির প্রধান কারণ।

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও জ্বালানি সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারেনি। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে দেওয়া অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

  • আমদানি নির্ভরতা: এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে, যা মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।
  • বিকল্পের অভাব: দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও তা অত্যন্ত সীমিত এবং ব্যয়বহুল।
  • মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা: ইউএনডিপি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশগুলো তাদের মজুদ তেল ব্যবহার করে সামাল দিলেও মজুদ শেষ হলে ক্ষতির পরিমাণ তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে যে, জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় একটি বড় ধরনের খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। এফএও’র প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো জরুরি ভিত্তিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিয়েছেন। সারের উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বের ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক পূর্বাভাস

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে অর্থনীতির অন্ধকার চিত্র তুলে ধরেছে:

  • আইএমএফ (IMF): অবকাঠামোর ক্ষতি এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার কথা ভাবছে।
  • এডিবি (ADB): এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৫.৪% থেকে ৫.১% এ নেমে আসতে পারে এবং ২০২৬ সালে আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি ৩.৬% এ ঠেকতে পারে।

পরিশেষে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পুনরায় আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবুও বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা খুব একটা সহজ হবে না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফিরলেন আটকে পড়া ২৩৮ ইরানি নাবিক

ইরান যুদ্ধের আগুনে এশিয়ার অর্থনীতি: হাজার কোটি ডলারের মহাক্ষতি

আপডেট সময় : ১১:২৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই যুদ্ধের ফলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি হাজার হাজার কোটি ডলারের লোকসানের মুখে পড়তে পারে, যা লাখ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

আর্থিক ক্ষতির সম্ভাব্য চিত্র

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যে আর্থিক আঘাত আসবে তার প্রধান দিকগুলো হলো:

  • বিপুল আর্থিক লোকসান: এ অঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯ হাজার ৭০০ কোটি থেকে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে, যা আঞ্চলিক জিডিপির প্রায় ০.৩% থেকে ০.৮%।
  • দারিদ্র্যের বিস্তার: বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়বে, যার মধ্যে শুধু এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই থাকবে ৮৮ লাখ মানুষ।
  • ব্যয় বৃদ্ধি: পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য এই ক্ষতির প্রধান কারণ।

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও জ্বালানি সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারেনি। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে দেওয়া অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

  • আমদানি নির্ভরতা: এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে, যা মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।
  • বিকল্পের অভাব: দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও তা অত্যন্ত সীমিত এবং ব্যয়বহুল।
  • মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা: ইউএনডিপি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশগুলো তাদের মজুদ তেল ব্যবহার করে সামাল দিলেও মজুদ শেষ হলে ক্ষতির পরিমাণ তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে যে, জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় একটি বড় ধরনের খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। এফএও’র প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো জরুরি ভিত্তিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিয়েছেন। সারের উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বের ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক পূর্বাভাস

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে অর্থনীতির অন্ধকার চিত্র তুলে ধরেছে:

  • আইএমএফ (IMF): অবকাঠামোর ক্ষতি এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার কথা ভাবছে।
  • এডিবি (ADB): এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৫.৪% থেকে ৫.১% এ নেমে আসতে পারে এবং ২০২৬ সালে আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি ৩.৬% এ ঠেকতে পারে।

পরিশেষে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পুনরায় আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবুও বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা খুব একটা সহজ হবে না।