দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭.৫৪ শতাংশে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার ৮৭৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা গত আট অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনা মহামারির চরম সংকটের সময়েও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি এতটা মন্থর ছিল না। চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ২ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চারভাগের একভাগও অর্জিত হয়নি, যার ফলে বছরের বাকি সময়ে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করার বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
গত আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তার প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইএমইডি’র প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার এডিপি বাস্তবায়নের হার ও ব্যয় উভয়ই আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গত অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে যেখানে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল, সেখানে এবার ব্যয় কমেছে ৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। যদিও গত ডিসেম্বর মাসে ব্যয়ের হার আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় কিছুটা বেশি দেখাচ্ছে, তবে এডিপির সামগ্রিক আকার ছোট হওয়ায় শতাংশের হিসাবে এই তারতম্য তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে এই মন্থর গতির পেছনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করেছেন। সরকারি ক্রয় বিধিমালায় সংস্কার এনে শতভাগ ই-জিপি টেন্ডার নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের গুণমান যাচাইয়ের কঠোর শর্তারোপের কারণে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীর হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক কর্মস্থল ত্যাগ করায় নতুন জনবল নিয়োগে সময় ব্যয় হয়েছে। একই সাথে সরকার বর্তমানে অনেক মেগা প্রকল্পের উপযোগিতা পর্যালোচনা করছে এবং নির্বাচনের বছর হওয়ায় অনেক মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের চাহিদা কম জানানো হয়েছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের উন্নয়ন বাজেটের খরচের খতিয়ানে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন হার মাত্র ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হার ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৩৬ শতাংশ ব্যয় করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। তবে রেলপথ ও সড়ক পরিবহন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাস্তবায়নের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের কারণে বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ও স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একটি নির্বাচিত সরকার আসলে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। ততক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের এই মন্থর গতি সামলানোই হবে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রিপোর্টারের নাম 
























