বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব ও নীতি-ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রেটিংয়ের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়। এর মধ্যে অন্যতম বিশ্বস্বীকৃত মূল্যায়ন হলো নিউ ইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রকাশিত ‘সেন্ট্রাল ব্যাংকার রিপোর্ট কার্ডস’। এই রেটিং গভর্নরের ব্যক্তিগত সাফল্য ছাড়িয়ে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, নীতিপারদর্শিতা এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রতিফলন ঘটায়।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের জন্য প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১০১টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই মূল্যায়নে গভর্নরদের ‘এ’ থেকে ‘এফ’ পর্যন্ত পাঁচটি প্রধান ক্যাটাগরিতে গ্রেড দেওয়া হয়েছে, যেখানে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, এবং ‘ডি’ ক্যাটাগরিগুলোকে আরও তিনটি সাব-ক্যাটাগরিতে (যেমন: ‘এ প্লাস’, ‘এ’ এবং ‘এ মাইনাস’) ভাগ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় মুদ্রাবিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুসংহত করার মতো বিষয়গুলো এই মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় সবচেয়ে সফল তিন গভর্নর হলেন ডেনমার্কের ক্রিশ্চিয়ান কেটেল থমাস, যুক্তরাষ্ট্রের জেরম হাইডেন পাওয়েল এবং ভিয়েতনামের গুয়েন থি হং, যারা ‘এ প্লাস’ গ্রেড পেয়েছেন। এই তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দুই ধাপ উন্নতি করে ‘সি+’ গ্রেড অর্জন করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কার গভর্নর নন্দলাল উইরাসিংহে ‘এ-‘ গ্রেড পেয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন, যিনি দেশটির দেউলিয়া অবস্থা ও অতিমুদ্রাস্ফীতি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানের জামিল আহমদ ‘বি-‘ গ্রেড পেয়েছেন। ভারতের সঞ্জয় মালহোত্রা এবং নেপালের বিশ্বনাথ পাওডেলকে ‘টিইটিএস’ (টু আরলি টু সে) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অর্থ তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
২০২৩ সালের মূল্যায়নে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর শক্তিকান্ত দাস ‘এ প্লাস’ গ্রেড পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালে নিযুক্ত শক্তিকান্ত দাস কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো দুটি বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ভারতের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সফল হন।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পি. নন্দলাল বীরাসিংহে দেশটির প্রায় ধসে পড়া অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে এনে বিশ্বে ‘অর্থনীতির জাদুকর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ে রাজাপাকসের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের সময় দেশটির মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। বীরাসিংহে আগ্রাসী সুদহার বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেন এবং বাজারভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। এর ফলস্বরূপ, শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের আগস্টে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
এশিয়ার আরেক দেশ ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর গুয়েন থি হং, যিনি প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে ‘এ প্লাস’ গ্রেড পেয়েছেন। ২০২০ সালের নভেম্বরে স্টেট ব্যাংক অব ভিয়েতনামের (এসবিভি) দায়িত্ব গ্রহণের পর হং দেশটির অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনেন। অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে যখন বেশিরভাগ দেশ সুদের হার বাড়াচ্ছিল, তখন ভিয়েতনাম উল্টো সুদের হার কমিয়েছে। তার এই দূরদর্শী নীতি ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে বিনিয়োগ-উন্মুক্ত করেছে এবং বহির্বিশ্বে দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
ডেনমার্কের ক্রিস্টিয়ান কেটেল থমসেন ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ডেনমার্কস ন্যাশনাল ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি ২০২২-২৩ সালের তীব্র মূল্যস্ফীতির সময় সফলভাবে অতিক্রম করে। সময়োপযোগী সুদের হার পরিবর্তন এবং স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ২০২২ সালে ৭-৮ শতাংশে পৌঁছানো মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ১-২ শতাংশে নেমে এসেছে। থমসেনের এই নেতৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে পূর্ববর্তী দুই গভর্নর ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়কালে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফজলে কবিরের সময়কালে ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয় এবং এসব ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই প্রক্রিয়াগুলোতে তৎকালীন গভর্নরের প্রশাসনিক সহায়তা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। তার সময়ে খেলাপি ঋণও ব্যাপকতা লাভ করে।
২০২২ সালের ১২ জুলাই গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়েও অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে অর্থ পাচার এবং লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তৈরি করা সূচকে তিনি ‘ডি’ গ্রেড পান। তার উদ্যোগেই কিছু ব্যাংক দখলের অভিযোগও আলোচনায় আসে। সামগ্রিকভাবে, এই দুই গভর্নরের নেতৃত্বাধীন সময়ে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে, যার ফলে দেশের অধিকাংশ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে বলে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক মহল থেকে সমালোচনা করা হয়।
রিপোর্টারের নাম 














