ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

মনোনয়নপত্র বাতিলের হিড়িক ও ইসির ছাড়: রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩২:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বইছে উৎসব ও উৎকণ্ঠার মিশ্র হাওয়া। দীর্ঘ দেড় দশক পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে আছে দেশের সাধারণ ভোটাররা। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণ ও জোট গঠনের সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ভূমিকা, বিশেষ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইনি প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন এবং ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ বলে গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন দাখিল করেন। গত ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আপিল শুনানিতে দেখা গেছে এক নজিরবিহীন চিত্র। সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে, শুনানির প্রথম সাত দিনেই বাতিল হওয়া প্রার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশই তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ৫১০টি আপিল শুনানি শেষে ৩৫৪ জন প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়ার বৈধতা দিয়েছে কমিশন।

অতীতের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে ইসিতে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার হার অনেক বেশি। ইতিপূর্বে এই হার অর্ধেকেরও কম ছিল। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের এই ব্যাপক পরিবর্তন নির্বাচনি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছে। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) আলোকে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণের যে মাপকাঠি রয়েছে, তা প্রয়োগে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কতটা বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত একজন প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচারণায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, যা মাঠের লড়াইয়ে একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। নির্বাচন কমিশন যদিও ক্ষুদ্র ভুলত্রুটি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের গরমিলকে ‘উদারভাবে’ দেখার নীতি গ্রহণ করেছে, তবে প্রশ্ন উঠছে—এই গাইডলাইন কেন আগেভাগেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি? রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত কর্মশালাগুলোতে যদি যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হতো, তবে এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীকে আইনি লড়াইয়ের বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না।

এদিকে, আপিল শুনানিতে রাজনৈতিক মেরুকরণের ভিন্ন চিত্রও ফুটে উঠেছে। দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একই দলের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো মৌলিক বিষয়ে কঠোর থাকলেও অন্যান্য ছোটখাটো ত্রুটিকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখছে মূলত ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং নির্বাচনকে উৎসবমুখর করার লক্ষ্যে।

আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে নির্বাচনি প্রচারণা। এই সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসক হিসেবে তারা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির প্রধান, তাই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হওয়া কাম্য নয়।

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কেবল নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাও সমানভাবে জরুরি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যেন ভোটারদের আস্থায় ফাটল না ধরায় এবং নির্বাচনি পরিবেশকে কলুষিত না করে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রার্থীরা যেন সমান সুযোগ পান এবং ভোটাররা যেন নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করাই হোক নির্বাচনি প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

মনোনয়নপত্র বাতিলের হিড়িক ও ইসির ছাড়: রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৯:৩২:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বইছে উৎসব ও উৎকণ্ঠার মিশ্র হাওয়া। দীর্ঘ দেড় দশক পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে আছে দেশের সাধারণ ভোটাররা। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণ ও জোট গঠনের সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ভূমিকা, বিশেষ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইনি প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন এবং ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ বলে গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন দাখিল করেন। গত ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আপিল শুনানিতে দেখা গেছে এক নজিরবিহীন চিত্র। সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে, শুনানির প্রথম সাত দিনেই বাতিল হওয়া প্রার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশই তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ৫১০টি আপিল শুনানি শেষে ৩৫৪ জন প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়ার বৈধতা দিয়েছে কমিশন।

অতীতের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে ইসিতে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার হার অনেক বেশি। ইতিপূর্বে এই হার অর্ধেকেরও কম ছিল। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের এই ব্যাপক পরিবর্তন নির্বাচনি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছে। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) আলোকে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণের যে মাপকাঠি রয়েছে, তা প্রয়োগে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কতটা বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত একজন প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচারণায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, যা মাঠের লড়াইয়ে একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। নির্বাচন কমিশন যদিও ক্ষুদ্র ভুলত্রুটি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের গরমিলকে ‘উদারভাবে’ দেখার নীতি গ্রহণ করেছে, তবে প্রশ্ন উঠছে—এই গাইডলাইন কেন আগেভাগেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি? রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত কর্মশালাগুলোতে যদি যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হতো, তবে এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীকে আইনি লড়াইয়ের বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না।

এদিকে, আপিল শুনানিতে রাজনৈতিক মেরুকরণের ভিন্ন চিত্রও ফুটে উঠেছে। দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একই দলের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো মৌলিক বিষয়ে কঠোর থাকলেও অন্যান্য ছোটখাটো ত্রুটিকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখছে মূলত ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং নির্বাচনকে উৎসবমুখর করার লক্ষ্যে।

আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে নির্বাচনি প্রচারণা। এই সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসক হিসেবে তারা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির প্রধান, তাই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হওয়া কাম্য নয়।

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কেবল নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাও সমানভাবে জরুরি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যেন ভোটারদের আস্থায় ফাটল না ধরায় এবং নির্বাচনি পরিবেশকে কলুষিত না করে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রার্থীরা যেন সমান সুযোগ পান এবং ভোটাররা যেন নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করাই হোক নির্বাচনি প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।