ঢাকা ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও শ্রমবাজারের সংকট: অর্থনীতিতে ঘনীভূত হচ্ছে আশঙ্কার মেঘ

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় দারিদ্র্যহার বৃদ্ধির যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা দেশের জন্য মোটেই ভালো কিছু নয়। যেহেতু একটি দেশের রাজনীতি সেই দেশটির অর্থনীতির গতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে, তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রকেই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যদিও অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার জন্য সেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জড়িতদের মধ্যে তেমন আস্থার সৃষ্টি করতে পারছে বলে মনে হয় না। ফলে দেশের দারিদ্র্যহার বৃদ্ধিকেও ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়ন ২০২৫ অনুযায়ী, এই বছর দারিদ্র্যহার ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে দেশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। গত বছরও ৩০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে। ওই মূল্যায়নে বর্তমানে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসে, দুর্বল শাসনব্যবস্থায়, কর্ম সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ইত্যাদি ক্ষেত্রে কম কার্যকর ছিল। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হয়ে উঠছে না, দেশে দরিদ্র জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।
প্রবাস আয় বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ কর্মী প্রেরণবিশ্বব্যাংক লাখ লাখ বাংলাদেশির জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ হিসেবে মনে করে। তাদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের সার্বিক দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করেছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলো অনেকটাই সচ্ছল হয়ে উঠেছে।

এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বলেছে যে অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গিয়ে মানবেতর জীবনযাত্রার সম্মুখীন হন এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসনে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের কারণে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের কর্মীদের বিদেশে যাওয়া সীমিত হয়ে পড়ে।
সর্বশেষে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওই দারিদ্র্য মূল্যায়নে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈষম্য সংকোচনে সহায়তা করার জন্য চারটি মূলনীতিগত ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে—উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করা; দরিদ্র ও অরক্ষিতদের জন্য উন্নততর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা; আধুনিক প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সহায়ক বিধি-বিধান প্রণয়ন করে দরিদ্রদের জন্য সহায়ক বাজারগুলোকে সক্ষম করা; আর শক্তিশালী রাজস্বনীতি এবং কার্যকর ও উন্নত লক্ষ্যের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বৃদ্ধি করা।

২৫ আগস্ট ২০২৫ প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২৭.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুযায়ী ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশ ছিল। অতি দরিদ্র মানুষের হার তিন বছর আগে থাকা ৫.৬ থেকে এ বছর ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রমবাজারের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং এ বছর আরো আট লাখ জনের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আর ওই চাকরি হারানোর বেশির ভাগই নারী ও তরুণ জনগোষ্ঠী।
বিভিন্ন সূত্রের এসব তথ্যের মধ্যে হয়তো কিছুটা হেরফের রয়েছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে যে সংকট তীব্রতর হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। একটি কথা না বললেই নয়, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতায় যে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলেই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এমনও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে আগামী দিনে অর্থনীতির এই স্থবিরতা থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারলে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে।

শুধু দেশের অভ্যন্তরেই যে এ অবস্থা চলছে তা নয়, বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই আমাদের অভিবাসী কর্মীরা ফিরে আসছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র তো শিকল দিয়ে বেঁধে অভিবাসীদের ফেরত পাঠাচ্ছে, হোন না তাঁরা অবৈধভাবে বসবাসকারী। বলার অপেক্ষা রাখে না, কর্মী প্রেরণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতির কারণে কয়েকটি দেশ তো আমাদের কর্মী নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, এক দশক ধরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রুমানিয়া ও ব্রুনেই বাংলাদেশি কর্মীদের নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়ায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া স্থগিত রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করলেও বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা প্রদান স্থগিত করেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ইরাকে আমাদের কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। গত মে মাসে প্রধান উপদেষ্টার জাপান সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুসরণে জাপান আগামী পাঁচ বছরে কমপক্ষে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কথা জানায়। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার ৪৭২ জন বাংলাদেশি কর্মী জাপানে গেছেন।

বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দশক আগেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কমপক্ষে ১২টি প্রধান বিদেশি শ্রমবাজার ছিল। সেই শ্রমবাজার এখন মাত্র দুই বা তিনটি দেশে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বর্তমানে অন্য কোথাও যাচ্ছেন না। এ বছর (১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিদেশে যাওয়া মোট ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৯৭৬ জন কর্মীর মধ্যে সাত লাখ ১৫ হাজার ৫৮৬ জনই সৌদি আরবে গেছেন। বাকিরা যেসব দেশে গেছেন তার মধ্যে রয়েছে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ, ওমান ও সিঙ্গাপুর। একটি কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই অদক্ষ।

এদিকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ বা বন্ধ হওয়া বাজারগুলো খোলার কাজটিও তেমন কিছু ইতিবাচক ফল আনতে পারছে বলে মনে হয় না। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বন্ধ হওয়া গন্তব্যগুলোতে কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা করা, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করা এবং যেসব দেশ থেকে কর্মী ফেরত আসছেন, তা বন্ধ করতে না পারলে দেশের অর্থনীতিতে যেমন চাপ পড়বে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে দারিদ্র্য বিপর্যয় দৃঢ় হয়ে উঠতে পারে। তাই দারিদ্র্য রোধের অন্যতম উপায় হিসেবে বিদেশে আমাদের বেশিসংখ্যক ও দক্ষ কর্মী প্রেরণের পদক্ষেপ গ্রহণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে দরিদ্র পরিবার থেকে কর্মী প্রেরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় সংকুলানের জন্য ঋণের ব্যবস্থাও করা যায়। যা হোক, একটি অভিবাসীবান্ধব এবং শোষণমুক্ত পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম দক্ষ কর্মী প্রেরণকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, যা বিদেশে আমাদের কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে এবং দেশের ভাবমূর্তি সংরক্ষণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও শ্রমবাজারের সংকট: অর্থনীতিতে ঘনীভূত হচ্ছে আশঙ্কার মেঘ

আপডেট সময় : ০৩:০২:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় দারিদ্র্যহার বৃদ্ধির যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা দেশের জন্য মোটেই ভালো কিছু নয়। যেহেতু একটি দেশের রাজনীতি সেই দেশটির অর্থনীতির গতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে, তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রকেই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যদিও অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার জন্য সেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জড়িতদের মধ্যে তেমন আস্থার সৃষ্টি করতে পারছে বলে মনে হয় না। ফলে দেশের দারিদ্র্যহার বৃদ্ধিকেও ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়ন ২০২৫ অনুযায়ী, এই বছর দারিদ্র্যহার ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে দেশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। গত বছরও ৩০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে। ওই মূল্যায়নে বর্তমানে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসে, দুর্বল শাসনব্যবস্থায়, কর্ম সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ইত্যাদি ক্ষেত্রে কম কার্যকর ছিল। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হয়ে উঠছে না, দেশে দরিদ্র জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।
প্রবাস আয় বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ কর্মী প্রেরণবিশ্বব্যাংক লাখ লাখ বাংলাদেশির জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ হিসেবে মনে করে। তাদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের সার্বিক দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করেছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলো অনেকটাই সচ্ছল হয়ে উঠেছে।

এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বলেছে যে অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গিয়ে মানবেতর জীবনযাত্রার সম্মুখীন হন এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসনে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের কারণে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের কর্মীদের বিদেশে যাওয়া সীমিত হয়ে পড়ে।
সর্বশেষে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওই দারিদ্র্য মূল্যায়নে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈষম্য সংকোচনে সহায়তা করার জন্য চারটি মূলনীতিগত ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে—উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করা; দরিদ্র ও অরক্ষিতদের জন্য উন্নততর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা; আধুনিক প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সহায়ক বিধি-বিধান প্রণয়ন করে দরিদ্রদের জন্য সহায়ক বাজারগুলোকে সক্ষম করা; আর শক্তিশালী রাজস্বনীতি এবং কার্যকর ও উন্নত লক্ষ্যের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বৃদ্ধি করা।

২৫ আগস্ট ২০২৫ প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২৭.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুযায়ী ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশ ছিল। অতি দরিদ্র মানুষের হার তিন বছর আগে থাকা ৫.৬ থেকে এ বছর ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রমবাজারের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং এ বছর আরো আট লাখ জনের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আর ওই চাকরি হারানোর বেশির ভাগই নারী ও তরুণ জনগোষ্ঠী।
বিভিন্ন সূত্রের এসব তথ্যের মধ্যে হয়তো কিছুটা হেরফের রয়েছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে যে সংকট তীব্রতর হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। একটি কথা না বললেই নয়, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতায় যে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলেই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এমনও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে আগামী দিনে অর্থনীতির এই স্থবিরতা থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারলে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে।

শুধু দেশের অভ্যন্তরেই যে এ অবস্থা চলছে তা নয়, বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই আমাদের অভিবাসী কর্মীরা ফিরে আসছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র তো শিকল দিয়ে বেঁধে অভিবাসীদের ফেরত পাঠাচ্ছে, হোন না তাঁরা অবৈধভাবে বসবাসকারী। বলার অপেক্ষা রাখে না, কর্মী প্রেরণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতির কারণে কয়েকটি দেশ তো আমাদের কর্মী নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, এক দশক ধরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রুমানিয়া ও ব্রুনেই বাংলাদেশি কর্মীদের নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়ায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া স্থগিত রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করলেও বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা প্রদান স্থগিত করেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ইরাকে আমাদের কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। গত মে মাসে প্রধান উপদেষ্টার জাপান সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুসরণে জাপান আগামী পাঁচ বছরে কমপক্ষে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কথা জানায়। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার ৪৭২ জন বাংলাদেশি কর্মী জাপানে গেছেন।

বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দশক আগেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কমপক্ষে ১২টি প্রধান বিদেশি শ্রমবাজার ছিল। সেই শ্রমবাজার এখন মাত্র দুই বা তিনটি দেশে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বর্তমানে অন্য কোথাও যাচ্ছেন না। এ বছর (১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিদেশে যাওয়া মোট ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৯৭৬ জন কর্মীর মধ্যে সাত লাখ ১৫ হাজার ৫৮৬ জনই সৌদি আরবে গেছেন। বাকিরা যেসব দেশে গেছেন তার মধ্যে রয়েছে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ, ওমান ও সিঙ্গাপুর। একটি কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই অদক্ষ।

এদিকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ বা বন্ধ হওয়া বাজারগুলো খোলার কাজটিও তেমন কিছু ইতিবাচক ফল আনতে পারছে বলে মনে হয় না। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বন্ধ হওয়া গন্তব্যগুলোতে কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা করা, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করা এবং যেসব দেশ থেকে কর্মী ফেরত আসছেন, তা বন্ধ করতে না পারলে দেশের অর্থনীতিতে যেমন চাপ পড়বে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে দারিদ্র্য বিপর্যয় দৃঢ় হয়ে উঠতে পারে। তাই দারিদ্র্য রোধের অন্যতম উপায় হিসেবে বিদেশে আমাদের বেশিসংখ্যক ও দক্ষ কর্মী প্রেরণের পদক্ষেপ গ্রহণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে দরিদ্র পরিবার থেকে কর্মী প্রেরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় সংকুলানের জন্য ঋণের ব্যবস্থাও করা যায়। যা হোক, একটি অভিবাসীবান্ধব এবং শোষণমুক্ত পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম দক্ষ কর্মী প্রেরণকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, যা বিদেশে আমাদের কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে এবং দেশের ভাবমূর্তি সংরক্ষণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।