২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী শাসন উৎখাতের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রকৃত জনমালিকানা প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়েছে। বর্ষাবিপ্লব বা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার বিশাল আত্মত্যাগ ও জীবনদানের পর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার যেকোনো প্রচেষ্টা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি নতুন ব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন এবং জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করার আহ্বান উঠেছে।
ক্ষমতাচ্যুতির পর কিছু রাজনৈতিক, সুশীল ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী মহলের মধ্যে পুরোনো বন্দোবস্ত বজায় রাখার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তারা ১৯৭২ সালের সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিদ্যমান কাঠামো ধরে রাখতে সচেষ্ট। তাদের মধ্যে স্বত্বাধিকার-তাড়না, মূর্খতা এবং ব্যক্তিগত লোভের কারণে এক ধরনের নেতিবাচক ঐক্য তৈরি হয়েছে, যা জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক গোষ্ঠী বিদেশি শক্তির আশ্রয়ে বেড়ে উঠছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এই পরিস্থিতিতে জনগণকে সচেতন হয়ে, পুনঃসক্রিয় হয়ে সম্মিলিতভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং আসন্ন গণভোটে ইতিবাচক রায় প্রদান ও নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এই অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
আলোচনার মূল বিষয় হলো, বর্ষাবিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশে জনমালিকানাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে ‘বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন’ (Change within the existing system) বলতে কেবল কাঠামোগত কিছু সংস্কারকে বোঝানো হচ্ছে, যা ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ ও সাধারণ মানুষের ক্ষমতাহীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে পরিচালিত হয়। এটি কায়েমি স্বার্থকে টিকিয়ে রাখে এবং সমাজের সুবিধাভোগী সংখ্যালঘু অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, ‘বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন’ (Change of the existing system) বলতে প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও পুনর্গঠনকে বোঝানো হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো কায়েমি স্বার্থ উৎখাত করে গুণগত পরিবর্তন আনা, যেখানে সাধারণ জনগণের জীবন ও অধিকার নিশ্চিত হবে। জনগণ যদি প্রজা বা দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তাসত্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে এই নতুন ব্যবস্থার দিকেই যেতে হবে। ক্ষমতা-উন্মাদ রাজনৈতিক চক্রকে মালিকের অবস্থান থেকে সরিয়ে জনকৃত্যক হিসেবে সাময়িক প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত অবস্থানে পাঠাতে হবে। একইভাবে, এলিট-সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-ফড়িয়া ব্যবসায়ীভিত্তিক রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে দিয়ে নতুন ধরনের রাষ্ট্রের আসল মালিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দলদাস, অন্ধ স্লোগানধারী বা ব্যক্তি-নেতা-পরিবার-ছবি-কবরপূজক হওয়ার মাঝে মুক্তি নেই। জনমালিকানাধীন রাষ্ট্রে জনগণের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাকর হতে পারে সাধারণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশকারী সমষ্টিকে দলবিহীন সমাজসত্তা হিসেবে সামনে ও কেন্দ্রে আনা। এই ভাঙন আর গঠনই বিকল্পহীন একমাত্র পথ, যার স্বপ্ন দেখিয়েছে বর্ষাবিপ্লব।
আসলে, প্রচলিত অচলায়তনমুখী চিন্তা, বিশ্বাস, মনোভঙ্গি, সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব ও অগণতান্ত্রিক দলকাঠামো থেকে সরে এসে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে চলার সুচিন্তিত বিবেচনাই নতুন বন্দোবস্তের দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম। একটি জনমালিকানাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চারটি মূল বিবেচনা সামনে আনা হচ্ছে:
প্রথমত, জনমালিকানাধীন রাষ্ট্রে জনগণের মর্যাদা সর্বোচ্চ। তারা সমষ্টিগত সচেতনতার মাধ্যমে সমাজচুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠন করবে। এখানে জনগণই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও নিয়ামক শক্তি। তারা রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক, অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগকারী, দায়দায়িত্ব পালনকারী এবং সরকার গঠনে একমাত্র নিয়ন্ত্রক। তাদের সম্মতি ও সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। একইসঙ্গে তারা কার্যকর অংশগ্রহণকারী ও মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র একটি কৃত্রিম ও প্রয়োজনীয় সত্তা, যার সকল প্রতিষ্ঠান, গঠনতন্ত্র, আইন ও ক্ষমতাকাঠামো সম্পূর্ণরূপে জন-ইচ্ছাধীন। নেতৃত্ব, দলকাঠামো, প্রতিনিধি, সরকার, আমলাতন্ত্র ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বেতন ও সুবিধাভোগী জনকৃত্যক। তারা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জননিয়ন্ত্রণাধীন ও অধস্তন। তারা জনগণের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য এবং জন-ইচ্ছায় প্রত্যাহার বা পদচ্যুত হতে পারে। তাদের কাজ কেবল জন-ইচ্ছা ও জননীতি বাস্তবায়ন করা।
তৃতীয়ত, যদি বিদ্যমান বন্দোবস্ত টিকিয়ে রেখে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা হয়, তবে জনগণ ক্ষমতাহীন প্রজা ও দাস হয়েই থাকবে। রাজনৈতিক মাতব্বর ও মোড়লচক্র জনকৃত্যক হয়েও মালিক সেজে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জনগণের ইচ্ছার বাইরে সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহৃত হবে। ক্ষমতা, উৎপাদন, বন্টন, বরাদ্দ, নীতি-কৌশল ও নিরাপত্তা—সবকিছুই জন-ইচ্ছাকে পদদলিত করে ক্ষমতা দখলদারদের ইচ্ছায় গণবিরোধী পথে পরিচালিত হবে। তাই জনগণের কর্তাসত্তা ও মালিকানা নিশ্চিত করতে নতুন বন্দোবস্ত অপরিহার্য।
চতুর্থত, বর্ষাবিপ্লবের মাধ্যমে প্রকাশিত গণআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হলে বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল ভাঙন ও নতুন গঠন দরকার। এতে জনগণ পরনির্ভরশীল দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও স্বনিয়ন্ত্রিত হবে। তারা প্রজা থেকে স্বাধীন ও মর্যাদাবান নাগরিক কর্তাসত্তা হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলকাঠামো তখন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ন্যায়ানুগভাবে জনসেবা করবে। গণভোটের রায় ও বিধান অনুযায়ী সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হবে। রাষ্ট্র কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের জনমালিকানাধীন। ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ এটি।
রিপোর্টারের নাম 














