বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ধরনের নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের দ্বি-দলীয় বৃত্তে আবদ্ধ জনমানুষের মধ্যে এখন একটি বিকল্প ও আদর্শভিত্তিক ধারার প্রতি কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের সাধারণ আলাপচারিতা ও জনমানসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনকালের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। বিশেষ করে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই প্রত্যাশাকে প্রাপ্তিতে রূপান্তর করতে দলটির সামনে যেমন বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কৌশলগত ও কাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের ‘অতীতমুখী’ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ‘ভবিষ্যৎমুখী’ রাজনীতির দিকে ধাবিত হওয়া এখন সময়ের দাবি। জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক বিবাদ ও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ২০৫১ সালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপকল্প উপস্থাপন করা। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তন। অর্থাৎ, কেবল আদর্শিক বুলি নয়, বরং ‘পারফরম্যান্স লেজিটিমেসি’ বা কর্মদক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করাই এখন দলটির প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মানুষ অর্থনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতকে ‘ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি’র দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। প্রথাগত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং যুবশক্তির সঠিক ব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাজির করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দলটির জন্য একটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বা ছায়া মন্ত্রিসভা এবং ‘১০০ দিনের রোডম্যাপ’ ঘোষণা করা কার্যকর কৌশল হতে পারে। মানুষ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, বরং তারা দেখতে চায় কার কাছে দেশের সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসী ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে জামায়াত তাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত গড়তে পারে। প্রবাসীদের কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক হিসেবে না দেখে তাদের ‘রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। প্রবাসী মন্ত্রণালয়কে একটি শক্তিশালী সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর এবং বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে প্রকৃত অর্থে সার্ভিস সেন্টারে পরিণত করার পরিকল্পনা জনমনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, দেশের লাখ লাখ বেকার যুবককে ‘মানবপুঁজি’তে রূপান্তর করতে কারিগরি ও বৈশ্বিক চাহিদাসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। ‘গ্লোবাল সার্ভিসেস এক্সপোর্ট হাব’ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তরুণ প্রজন্মের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিরাপত্তা ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, থানায় ডিজিটাল অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন এবং দ্রুততম সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মতো সাহসী পদক্ষেপগুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ সেবা নিশ্চিত করার মতো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে।
মূলত, আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এখন আর কেবল আবেগের রাজনীতিতে তুষ্ট নয়। তারা চায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং গ্যারান্টি। জামায়াত যদি তাদের রাজনৈতিক ভাষাকে জটিলতা থেকে মুক্ত করে সহজ ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনায় রূপান্তর করতে পারে, তবেই তারা নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে। অতীতের দোষারোপের সংস্কৃতি ছেড়ে ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়ার এই প্রতিযোগিতায় যারা বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবে, ভোটারদের পাল্লা তাদের দিকেই ঝুঁকবে। সময় এখন তত্ত্বকথার নয়, বরং প্রয়োগিক রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের মন জয় করার।
রিপোর্টারের নাম 














