ঢাকা ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

নির্বাচনী সমতল ক্ষেত্র: গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাষ্ট্রের অগ্নিপরীক্ষা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪২:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমতা বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা কেবল একটি আদর্শিক আলোচনা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিপক্কতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। সম্প্রতি সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মতো আলোচিত ব্যক্তির ওপর প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও প্রকট করে তুলেছে: আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছি, নাকি ক্ষমতার একতরফা প্রয়োগের ‘রণক্ষেত্র’-এ প্রবেশ করছি? এই প্রেক্ষাপটে, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেবল প্রার্থীদের জন্য সমান প্রচারণার সুযোগ বোঝায় না; এটি গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। এর সাফল্যের জন্য তিনটি মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে:

১. নিরাপত্তার সমতা: গণতন্ত্রে প্রত্যেক প্রার্থীর নির্ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার মৌলিক। যখন একজন প্রার্থী নিরাপত্তার অভাবে স্বাভাবিক প্রচারও চালাতে পারেন না, অথচ অন্য পক্ষ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবাধে বিচরণ করে, তখন এই সমতা ভেঙে পড়ে। শরীফ ওসমানের ওপর হামলা সরাসরি ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্র তার সকল নাগরিক ও প্রার্থীর জন্য ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এটি ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে, যা ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।

২. সম্পদের সমতা: নির্বাচনের মূল লড়াই হওয়া উচিত নীতি ও আদর্শের, অর্থ বা পেশিশক্তির নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। যখন অনেক প্রার্থী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বিলবোর্ড, প্রচারের স্থান ও গণমাধ্যমের সুবিধা একচেটিয়াভাবে ভোগ করেন, তখন অন্য প্রার্থীরা অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এটি দরিদ্র বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং নির্বাচনকে ‘অর্থের খেলা’য়’ পরিণত করে। এই বৈষম্য দূর না হলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনকারী সরকার গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ: এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে অবশ্যই দল, ক্ষমতা বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। যখন দেখা যায়, এক পক্ষের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব থাকে এবং অন্য পক্ষের সামান্য ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষ আইনের শাসনের ওপর আস্থা হারায়। এই পক্ষপাতিত্ব কেবল নির্বাচনের ফলাফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, এটি রাষ্ট্রকে তার মৌলিক নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত করে।

ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি দুটি গুরুতর সামাজিক ক্ষতি সাধন করে:

ক. ভোটারদের ভীতি ও নিরুৎসাহ: যখন ভোটাররা দেখেন যে, তাদের পছন্দের প্রার্থীর ওপর হামলা হচ্ছে বা তাকে প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা ভোটকেন্দ্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হন। এই ভীতি এক ধরনের নীরব সহিংসতা তৈরি করে, যা ভোটারদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর ফলে পেশিশক্তি প্রয়োগকারীরা সুবিধা পায় এবং জনমতের প্রতিফলন ব্যাহত হয়।

খ. গণতন্ত্রের প্রতীকী মূল্য হ্রাস: লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে নির্বাচন ব্যবস্থা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং দেশের জনগণ মনে করে যে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল, জনগণের ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এই অনাস্থা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের মনে রাখা উচিত যে, তাদের কাজ কেবল ভোটের দিনের ব্যবস্থাপনা নয়, বরং ভোটের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে পক্ষপাতমুক্ত রাখা। এজন্য সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। যেকোনো প্রার্থীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা প্রচারকাজে বাধা দেওয়া হলে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি প্রশাসনের শপথ।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়; এটি দেশের গণতন্ত্রের টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা মানেই হলো, সকল প্রার্থীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ সুগম করা এবং সকল ভোটারের জন্য ভীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। জাতি আজ অধীর আগ্রহে প্রশাসনের সেই দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপের অপেক্ষায়, যা নিশ্চিত করবে যে, এবারের নির্বাচন ক্ষমতার লড়াই নয়, গণতন্ত্রের বিজয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

নির্বাচনী সমতল ক্ষেত্র: গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাষ্ট্রের অগ্নিপরীক্ষা

আপডেট সময় : ০৬:৪২:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমতা বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা কেবল একটি আদর্শিক আলোচনা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিপক্কতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। সম্প্রতি সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মতো আলোচিত ব্যক্তির ওপর প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও প্রকট করে তুলেছে: আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছি, নাকি ক্ষমতার একতরফা প্রয়োগের ‘রণক্ষেত্র’-এ প্রবেশ করছি? এই প্রেক্ষাপটে, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেবল প্রার্থীদের জন্য সমান প্রচারণার সুযোগ বোঝায় না; এটি গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। এর সাফল্যের জন্য তিনটি মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে:

১. নিরাপত্তার সমতা: গণতন্ত্রে প্রত্যেক প্রার্থীর নির্ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার মৌলিক। যখন একজন প্রার্থী নিরাপত্তার অভাবে স্বাভাবিক প্রচারও চালাতে পারেন না, অথচ অন্য পক্ষ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবাধে বিচরণ করে, তখন এই সমতা ভেঙে পড়ে। শরীফ ওসমানের ওপর হামলা সরাসরি ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্র তার সকল নাগরিক ও প্রার্থীর জন্য ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এটি ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে, যা ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।

২. সম্পদের সমতা: নির্বাচনের মূল লড়াই হওয়া উচিত নীতি ও আদর্শের, অর্থ বা পেশিশক্তির নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। যখন অনেক প্রার্থী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বিলবোর্ড, প্রচারের স্থান ও গণমাধ্যমের সুবিধা একচেটিয়াভাবে ভোগ করেন, তখন অন্য প্রার্থীরা অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এটি দরিদ্র বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং নির্বাচনকে ‘অর্থের খেলা’য়’ পরিণত করে। এই বৈষম্য দূর না হলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনকারী সরকার গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ: এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে অবশ্যই দল, ক্ষমতা বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। যখন দেখা যায়, এক পক্ষের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব থাকে এবং অন্য পক্ষের সামান্য ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষ আইনের শাসনের ওপর আস্থা হারায়। এই পক্ষপাতিত্ব কেবল নির্বাচনের ফলাফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, এটি রাষ্ট্রকে তার মৌলিক নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত করে।

ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি দুটি গুরুতর সামাজিক ক্ষতি সাধন করে:

ক. ভোটারদের ভীতি ও নিরুৎসাহ: যখন ভোটাররা দেখেন যে, তাদের পছন্দের প্রার্থীর ওপর হামলা হচ্ছে বা তাকে প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা ভোটকেন্দ্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হন। এই ভীতি এক ধরনের নীরব সহিংসতা তৈরি করে, যা ভোটারদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর ফলে পেশিশক্তি প্রয়োগকারীরা সুবিধা পায় এবং জনমতের প্রতিফলন ব্যাহত হয়।

খ. গণতন্ত্রের প্রতীকী মূল্য হ্রাস: লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে নির্বাচন ব্যবস্থা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং দেশের জনগণ মনে করে যে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল, জনগণের ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এই অনাস্থা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের মনে রাখা উচিত যে, তাদের কাজ কেবল ভোটের দিনের ব্যবস্থাপনা নয়, বরং ভোটের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে পক্ষপাতমুক্ত রাখা। এজন্য সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। যেকোনো প্রার্থীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা প্রচারকাজে বাধা দেওয়া হলে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি প্রশাসনের শপথ।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়; এটি দেশের গণতন্ত্রের টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা মানেই হলো, সকল প্রার্থীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ সুগম করা এবং সকল ভোটারের জন্য ভীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। জাতি আজ অধীর আগ্রহে প্রশাসনের সেই দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপের অপেক্ষায়, যা নিশ্চিত করবে যে, এবারের নির্বাচন ক্ষমতার লড়াই নয়, গণতন্ত্রের বিজয়।