২০২২ সালে ইরানে যখন নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন পুরো বিশ্বের নজর ছিল তেহরানের দিকে। বিশেষ করে আরব বিশ্বের দেশগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল সেই পরিস্থিতি। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের যে প্রভাব ও মিত্রদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল, তা ওই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য ছিল বড় উদ্বেগের কারণ। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, বিক্ষোভের মুখে ইরান সরকারের পতন হলে তা প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর জন্য স্বস্তির কারণ হবে।
সেই সময় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলো দিন-রাত বিক্ষোভের খবর প্রচার করত। বিক্ষোভকারীদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও সহানুভূতি লক্ষ্য করা যেত তাদের সংবাদে। আরব কূটনীতিকরা প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তেহরানের সংকট নিয়ে তাদের সন্তুষ্টির বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান হোসেন সালামি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানে আবারও নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় সরকারের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এবার আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া একেবারেই ম্লান। আরব দেশগুলোর সান্ধ্যকালীন নিউজ বুলেটিনে ইরান এখন আর প্রধান খবর নয়। কূটনীতিক ও কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কথা বলতে রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করছেন। তাদের এই আচমকা নীরবতার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের আগের সেই দাপট এখন আর নেই। গত এক বছরে ইসরায়েলের সাথে সংঘাত এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা মিত্র গোষ্ঠীগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল। সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ইরানের জন্য এক বড় ধাক্কা। এমনকি ইরানের অভ্যন্তরেও ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলায় সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হোসেন সালামির মতো প্রভাবশালী সামরিক অধিনায়করাও এখন আর দৃশ্যপটে নেই। ফলে আরব দেশগুলো এখন ইরানকে আগের মতো বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না।
দ্বিতীয় কারণটি হলো, ইরানের সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা বা ক্ষমতার শূন্যতা নিয়ে আরব দেশগুলোর গভীর উদ্বেগ। উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প ইরান সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও আরব দেশগুলো ভয় পাচ্ছে যে, তেহরান যদি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ে, তবে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালাতে পারে। কাতার বা বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের স্বল্পপাল্লার মিসাইলের সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এছাড়া একটি বিশাল জনবহুল দেশ হিসেবে ইরানের পতন হলে যে ধরনের মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা প্রতিবেশী দেশগুলোর নেই। ৯২ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটি দেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তার প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে পড়বে। সিরিয়া বা ইরাকের অস্থিতিশীলতার ফলে সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদ ও মাদক চোরাচালানের তিক্ত অভিজ্ঞতা আরব দেশগুলোর এখনো কাটেনি। এর ওপর ইরানের হাতে থাকা উন্নত ড্রোন, মিসাইল এবং পারমাণবিক উপাদানের নিয়ন্ত্রণ যদি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তবে তা হবে পুরো অঞ্চলের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।
সার্বিকভাবে, আরব দেশগুলো হয়তো ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে পছন্দ করে না, কিন্তু তারা দেশটিতে কোনো রক্তাক্ত অভ্যুত্থান বা অরাজকতাও চায় না। কয়েক বছরের টানা যুদ্ধে ক্লান্ত এই অঞ্চল এখন স্থিতিশীলতা চায়। ইরানের বর্তমান সংকটে আরব বিশ্বের এই রহস্যময় নীরবতা মূলত তাদের কৌশলগত সতর্কতা এবং আগামী দিনের অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের রক্ষার একটি প্রচেষ্টা। তারা চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মিলিশিয়া তোষণ বন্ধ হোক, কিন্তু সেটা যেন কোনো বড় ধ্বংসযজ্ঞের বিনিময়ে না হয়। এই দ্বিধা আর আশঙ্কার কারণেই তেহরানের রাজপথ উত্তাল থাকলেও আরব বিশ্বের ড্রয়িংরুমে এখন পিনপতন নীরবতা।
রিপোর্টারের নাম 














