ডিজিটাল যুগে সংবাদ পরিবেশনের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি তার ভাষা ও কৌশলও পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। এই পরিবর্তনের এক অন্যতম দৃশ্যমান রূপ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ফটোকার্ড’। একটি ছবি এবং তার ওপর বড় ফন্টে কয়েকটি শব্দ দিয়ে তৈরি এই সংক্ষিপ্ত বার্তাগুলো দ্রুত খবর পৌঁছে দিলেও, এর সহজীকরণের আড়ালে এক বিপজ্জনক প্রবণতা জন্ম নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিকে ক্রমেই সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সচেতন মহলের মতে, এর দায়িত্বহীন ব্যবহার সমাজে এক ধরনের ‘ফটোকার্ডকেন্দ্রিক অস্থিরতা’ তৈরি করছে।
আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ‘স্ক্রল-সংস্কৃতি’র সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ফটোকার্ডকে বেছে নিয়েছে। কারণ, অনেক পাঠকই পুরো সংবাদ পড়ার ধৈর্য রাখেন না; কেবল চোখে পড়লেই ক্লিক, রিঅ্যাক্ট বা শেয়ার করেন। এর ফলে জটিল ও বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে এক লাইনে নামিয়ে আনার প্রবণতা বেড়েছে। সমস্যাটি তখনই শুরু হয়, যখন এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সত্যের চেয়ে উত্তেজনা বা চাঞ্চল্য বেশি প্রাধান্য পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ফটোকার্ডগুলো প্রায়শই উসকানিমূলক, চাঞ্চল্যকর এবং উত্তেজনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ পূর্ণ খবরটি পড়লে দেখা যায়, বাস্তবতা অনেক বেশি সংযত ও বহুমাত্রিক, যা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট সুযোগ রাখে। কখনো কখনো ফটোকার্ডের সঙ্গে মূল খবরের বিষয়বস্তুর মিল থাকে না, বা খবরের একাংশকে প্রসঙ্গহীনভাবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু ফটোকার্ড একটি নির্দিষ্ট বয়ানই পাঠকের মনে চাপিয়ে দেয়। এতে পাঠকের মনে ক্ষোভ, আতঙ্ক কিংবা ঘৃণা তৈরি হয়, যা পরে সামাজিক উত্তেজনায় রূপ নেয়।
দেশের রাজনীতি এমনিতেই তীব্র মেরূকরণের শিকার। ফটোকার্ড এই মেরূকরণকে আরও ধারালো করে তুলেছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের একাংশ কেটে এনে, বা প্রসঙ্গহীনভাবে ফটোকার্ডে বসিয়ে দেওয়া হয়। এর ফল হয় সুদূরপ্রসারী – এক পক্ষ উল্লসিত হয়, অন্য পক্ষ ক্ষুব্ধ। কমেন্ট বক্সে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে শুরু হয় গালাগালি ও হুমকি। অনেক সময় অনলাইনের এই বিরোধ বাস্তব জীবনেও সংঘাত ডেকে আনে। সংবাদ এখানে তথ্যের বাহক না হয়ে পরিণত হয় রাজনৈতিক অস্ত্রে, যা দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেকার সম্পর্কে তিক্ততা বাড়াচ্ছে এবং দেশকে সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।
ফটোকার্ডকেন্দ্রিক এই অস্থিরতা মূলত সাংবাদিকতার নৈতিক সংকটেরই প্রতিফলন। ভিউ, রিচ এবং এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় সত্য, যাচাই-বাছাই এবং ভারসাম্য গৌণ হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড সংশোধনের আগেই হাজার হাজারবার শেয়ার হয়ে গেছে। পরে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বা সংশোধনী প্রকাশ করা হলেও ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে যায়।
এই ধারাবাহিক বিভ্রান্তি সমাজে অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে। মানুষ ক্রমশ সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষ মনে করছে না এবং গুজব ও খবরের পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যেকোনো ইস্যুতে একটি ভুল ফটোকার্ড মুহূর্তেই পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে। এভাবেই দেশ ধীরে ধীরে এক অনিবার্য সংঘাতের পথে এগোচ্ছে।
কিন্তু একটি দেশের সংবাদমাধ্যম এভাবে চলতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণে তিন পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে – মিডিয়া, রাষ্ট্র এবং পাঠক। মিডিয়ার দায়িত্ব হলো, ফটোকার্ডে সংযম, নির্ভুল শব্দচয়ন এবং প্রাসঙ্গিকতা নিশ্চিত করা। উত্তেজনা নয়, তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ করা। আর সচেতন পাঠকের উচিত একটি ফটোকার্ড দেখেই প্রতিক্রিয়া না দিয়ে পুরো খবর পড়া এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। ফটোকার্ড নিজে কোনো অপরাধ নয়; অপরাধ হলো এর দায়িত্বহীন ব্যবহার। সংবাদ যদি আলো জ্বালানোর বদলে আগুন ধরায়, তবে তা সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়; বরং অভিশাপ। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও ভবিষ্যতের শান্তি এবং স্থিতিশীলতার স্বার্থে মিডিয়ার এই ফটোকার্ডকেন্দ্রিক অস্থিরতা এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। অন্যথায়, আমরা সবাই অজান্তেই এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে হাঁটছি।
রিপোর্টারের নাম 















