ঢাকা ০১:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গুম ও শতাধিক খুনের অভিযোগ: মানবতাবিরোধী অপরাধে জিয়াউল আহসানের বিচার শুরু

গুম করে শতাধিক ব্যক্তিকে খুন করার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তাঁর আইনজীবী মনসুরুল হক ও নাজনিন নাহার। তাঁরা যুক্তি দেন যে, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে পারেনি এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে জিয়াউলকে অব্যাহতির আবেদন জানান। এরপর প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে ‘প্রাইমা ফেসি’ বা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানান। উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন এবং ওই দিন (১৪ জানুয়ারি, যা ছিল বুধবার) বিচার শুরুর আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, গত ৪ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনে শুনানি করেন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ তুলে ধরেন।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে অবৈধভাবে আটক সজলসহ তিনজন বন্দিকে নিয়ে জিয়াউল ও তাঁর দল গাজীপুরের দিকে রওয়ানা হন। ঢাকা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দিদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল।

দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী এলাকা ও বলেশ্বর নদীর মোহনা ছিল জিয়াউল আহসানের পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘হটস্পট’। গভীর রাতে বন্দিদের ট্রলার বা নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে মাথা বা বুকে বালিশ চেপে গুলি করা হতো। পরে পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিকে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোড নামে পরিচালনা করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এভাবে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ কমপক্ষে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা অভিযান পরিচালনা করা হতো। পূর্বে আটক ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের বনদস্যু সাজিয়ে গভীর রাতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখানো হতো। এসব অভিযানে র‍্যাবের বাছাই করা সদস্যরা অংশ নিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজেই উপস্থিত থাকতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’ নামে তিনটি অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

গুম ও শতাধিক খুনের অভিযোগ: মানবতাবিরোধী অপরাধে জিয়াউল আহসানের বিচার শুরু

আপডেট সময় : ১২:২৫:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

গুম করে শতাধিক ব্যক্তিকে খুন করার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তাঁর আইনজীবী মনসুরুল হক ও নাজনিন নাহার। তাঁরা যুক্তি দেন যে, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে পারেনি এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে জিয়াউলকে অব্যাহতির আবেদন জানান। এরপর প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে ‘প্রাইমা ফেসি’ বা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানান। উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন এবং ওই দিন (১৪ জানুয়ারি, যা ছিল বুধবার) বিচার শুরুর আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, গত ৪ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনে শুনানি করেন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ তুলে ধরেন।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে অবৈধভাবে আটক সজলসহ তিনজন বন্দিকে নিয়ে জিয়াউল ও তাঁর দল গাজীপুরের দিকে রওয়ানা হন। ঢাকা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দিদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল।

দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী এলাকা ও বলেশ্বর নদীর মোহনা ছিল জিয়াউল আহসানের পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘হটস্পট’। গভীর রাতে বন্দিদের ট্রলার বা নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে মাথা বা বুকে বালিশ চেপে গুলি করা হতো। পরে পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিকে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোড নামে পরিচালনা করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এভাবে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ কমপক্ষে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা অভিযান পরিচালনা করা হতো। পূর্বে আটক ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের বনদস্যু সাজিয়ে গভীর রাতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখানো হতো। এসব অভিযানে র‍্যাবের বাছাই করা সদস্যরা অংশ নিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজেই উপস্থিত থাকতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’ নামে তিনটি অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।