আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাই প্রক্রিয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্বৈতনীতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের তথ্য বা আইনি জটিলতা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত দেওয়ায় নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি শুরুতেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রে ছোটখাটো ত্রুটি সংশোধন বা রিভিউয়ের সুযোগ দেওয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন যে, স্থানীয় প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দিতেই এমন বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।
বাছাই প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতির একটি বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র প্রথমে বাতিল হলেও পরে রিভিউয়ের মাধ্যমে তা বৈধ করা হয়। অথচ একই দলের কক্সবাজার-২ আসনের প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ রিভিউয়ের আবেদন করলে রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান যে, পুনর্বিবেচনার কোনো বিধানই নেই। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে মামলার সাজাকে কেন্দ্র করে হামিদুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, একই মামলার অন্য দুই আসামি রফিকুল ইসলাম খান ও সেলিম উদ্দীনের প্রার্থিতা যথাক্রমে সিরাজগঞ্জ ও সিলেটে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে কুড়িগ্রামে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও একই সমস্যায় থাকা সিলেট-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের মনোনয়নপত্র বাতিল না করে স্থগিত রাখা হয়েছে। এমনকি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বৈচিত্র্য; বগুড়ায় তাঁর মনোনয়ন আটকে গেলেও একই কাগজপত্র দিয়ে ঢাকার আসনে তিনি বৈধতা পেয়েছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকার জটিলতা বা সামান্য ভুলের কারণে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যা ভোটারদের গোপনীয়তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। নির্বাচন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের পরিপত্রে ছোটখাটো কারণে মনোনয়ন বাতিলের বিপক্ষে নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তা সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে পারছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী এই প্রক্রিয়াকে ‘আইনি ইঞ্জিনিয়ারিং’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, স্বতন্ত্র বা ছোট দলের প্রার্থীদের জন্য শর্তগুলো এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে তারা সহজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারে।
সারাদেশে জমা পড়া ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ৭২৩টি বাতিল হওয়া নিয়ে এখন চারদিকে তোলপাড় চলছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এই দ্বিমুখী আচরণের ফলে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন, যা তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া নির্বাচন কমিশনের আপিল বিভাগে যদি সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা ন্যায়বিচার পান এবং যৌক্তিকভাবে প্রার্থিতা ফিরে পান, তবেই কমিশনের নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর ও অভিন্ন নীতিমালা প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 

























