কুয়াশামাখা ভোরে তখনও পূর্বাকাশে সূর্য ওঠেনি। তবে ঘড়ি দেখে বুঝতে পারলাম সকাল হয়েছে অনেক আগেই। ঘড়িতে তখন ৯টা বেজে ২৬ মিনিট। পুরোনো ঢাকার রায় সাহেব বাজার মোড় থেকে রিকশাযোগে রওনা দিলাম মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের উদ্দেশে। পথে পথে বহু মানুষের সঙ্গে দেখা। প্রত্যেকের গন্তব্যস্থল বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাস্থল।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যাওয়ার পথে দেখা যায়, শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে মূল সড়কের দুই পাশ দিয়ে শীতবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে নীরবে হেঁটে হেঁটে সবাই জানাজাস্থলের দিকে ছুটছেন। এদের মধ্যে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা যেমন ছিল, তেমনি সাধারণ পেশাজীবীরাও ছিল। দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ছুটছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে।
এদিকে, মানুষের ভিড় ঠেলে রিকশা এগিয়ে যাওয়া প্রায় সম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উপায় না দেখে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের উদ্দেশে। পথিমধ্যে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও তার শাসনামল নিয়ে। অনেকেই জানান, খালেদা জিয়ার নীতি নৈতিকতা ছিল অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় ব্যতিক্রম। বিরোধীদের প্রতি নোংরামি বা বিষোদ্গার নয় বরং রাজনীতিতে সহনশীলতার আদর্শ রেখে গেছেন তিনি।
মোরসালিন আহমেদ নামের একজন ব্যাংকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া কখনোই প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। তার বক্তব্যে তিনি কখনও কাউকে ছোট করে কথা বলেননি। এমনকি, তাকে যেসব অশালীন অভিযোগ ও লাঞ্ছনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোরও তিনি জোর গলায় প্রতিবাদ করেননি। তিনি কেবল ধৈর্য ধরে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সে সকল পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। আর সহনশীলতার বার্তা নিয়ে গেছেন।”
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বেলা এগারোটায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে দেখা যায়, খালেদা জিয়ার জানাজার নামাজে অংশ নিতে অসংখ্য মানুষ অনেক আগেই উপস্থিত হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভোর ৭টা বাজতেই জানাজা স্থলে উপস্থিত হয়েছেন কেউ কেউ। তাদের মধ্যে একজন মোতালেব হোসেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আমি কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী নই। আমি একজন শিক্ষক। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে একটি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করছি। বেগম জিয়ার মৃত্যু খবর জানার পর থেকেই খুব ইচ্ছে ছিল তার জানাজার নামাজে অংশ নেয়াওর। তাই ফজরের নামাজ পড়ে বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে চলে এসেছি।”
খালেদা জিয়ার শাসনামলের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার তিন আমল আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি এইটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি, তিনি অন্যান্য শাসকদের থেকে আলাদা ছিল। তার কথাবার্তায় সবসময় মহানুভবতা ছিল। তিনি কখনও উদ্ধতপূর্ণ আচরণ করেনি। সরকারে থাকাকালীন তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের কটাক্ষ করেননি। এমনকি, গত ১৭ বছরের অমানবিক অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েও কখনও কারও প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ করেননি। তার সহনশীলতা এ প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।”
বেলা বাড়তেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের এলাকাসহ চারপাশে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। দুপুর ১টার আগেই লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে সেখানে। যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। এরইমধ্যে খালেদা জিয়ার মরদেহ এসে হাজির হয় জানাজা স্থলে। উপস্থিত মানুষের চোখে মুখে ছিল স্পষ্ট বেদনার চাপ। কেউ নীরবে নিভৃতে চোখের পানি ফেলেছেন আবার কেউবা আহাজারিও করেছেন।
জানাজাস্থলে উপস্থিত আবু নাসের নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “খালেদা জিয়া ছিলেন প্রকৃতঅর্থে স্বজনহারা। তবুও দেশের মানুষকে স্বজন মনে করে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এ দেশেই থেকেছেন। স্বজন হারানোর বেদনার কান্না তিনি কখনোই প্রকাশ করেননি। দেশের মানুষের প্রয়োজনে, তাদের ডাকে সাড়া দিয়েই তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। কোনও হত্যার বিচার কিংবা প্রতিশোধের নামে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করতে নয়। নির্বাচিত হওয়ার জন্য তাকে কখনোই রাতের আঁধারে ভোট ডাকাতির আশ্রয় নিতে হয়নি।”
এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, “নতুন প্রজন্ম তার শাসনকাল প্রত্যক্ষ না করলেও, তাকে গণতন্ত্রের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে, তার জন্য কাঁদছে। এটিই প্রমাণ করে, তিনি একজন সত্যিকারের আদর্শবান রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনীতিতে সহনশীলতার একটি অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন তিনি “
বিকাল ৩টা ৫মিনিটে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক এর ইমামতিতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন হয়। এতে স্মরণকালের রেকর্ডসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জামায়াত, জাতীয় পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জাতীয় নেতারা। এছাড়াও জানাজায় বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন দেশের ৩২ জন কূটনীতিক অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিকাল সাড়ে ৪টায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় খালেদা জিয়াকে।
জানাজায় অংশ নেওয়া বয়োজ্যেষ্ঠ লোকজনের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় জানাজা আর হয়নি। শেষবার কেবল জিয়াউর রহমানের জানাজার নামাজে এতবেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। জানাজার নামাজে উপস্থিত মোস্তফা কামাল নামের ষাটোর্ধ্ব একজন প্রবীণ বলেন, “এই জনসমাগম কোনও রাজনৈতিক দলের প্রধানের জন্য নয়, এই জনসমাগম সর্বজন শ্রদ্ধেয়, দেশপ্রেমিক ও আদর্শবান একজন সহনশীল সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রীর জন্য মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। অন্তত ৩০ থেকে ৪০ লাখ লোকের সমাগমে প্রায় ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের রাজসিক বিদায় হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার।”
রিপোর্টারের নাম 

























