ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

চিরতরে নিভে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা: বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের আপসহীন প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রদীপ্ত দ্যুতি ছড়ানো এই ধ্রুবতারা মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। টানা ৩৮ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি কোটি কোটি মানুষকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। তাঁর মৃত্যুকালে বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য এবং দলের শীর্ষ নেতারা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অপূরণীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং আজ বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া বিএনপি সাত দিনের শোক কর্মসূচি পালন করছে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন এবং বিদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আজ বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হবে। জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ইতোমধ্যে ঢাকায় সমবেত হয়েছেন। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সংগ্রামমুখর। ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা এই নেত্রী ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দুই শিশুপুত্রসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর এক কঠিন সংকটের মুখে তিনি রাজনীতির হাল ধরেন। সাধারণ গৃহবধূ থেকে উঠে এসে তিনি জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে আপসহীন আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে অসীম ত্যাগ স্বীকার করা এই নেত্রী তিন মেয়াদে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, নারী শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং যমুনা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে চরম প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকার এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাস ও নিপীড়ন সহ্য করেছেন। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছর ভিত্তিহীন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এবং অসুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েও তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতনের পর তিনি মুক্ত নিঃশ্বাস নিলেও শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও অসুস্থতার কাছে পরাজিত হলেন। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘দেশনেত্রী’ এবং ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ড্রোন বিধ্বস্ত

চিরতরে নিভে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা: বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান

আপডেট সময় : ১০:৪৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের আপসহীন প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রদীপ্ত দ্যুতি ছড়ানো এই ধ্রুবতারা মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। টানা ৩৮ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি কোটি কোটি মানুষকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। তাঁর মৃত্যুকালে বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য এবং দলের শীর্ষ নেতারা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অপূরণীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং আজ বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া বিএনপি সাত দিনের শোক কর্মসূচি পালন করছে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন এবং বিদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আজ বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হবে। জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ইতোমধ্যে ঢাকায় সমবেত হয়েছেন। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সংগ্রামমুখর। ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা এই নেত্রী ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দুই শিশুপুত্রসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর এক কঠিন সংকটের মুখে তিনি রাজনীতির হাল ধরেন। সাধারণ গৃহবধূ থেকে উঠে এসে তিনি জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে আপসহীন আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে অসীম ত্যাগ স্বীকার করা এই নেত্রী তিন মেয়াদে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর শাসনামলে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, নারী শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং যমুনা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে চরম প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকার এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবাস ও নিপীড়ন সহ্য করেছেন। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছর ভিত্তিহীন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এবং অসুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েও তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতনের পর তিনি মুক্ত নিঃশ্বাস নিলেও শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও অসুস্থতার কাছে পরাজিত হলেন। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘দেশনেত্রী’ এবং ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।