শীতকাল দরজায় কড়া নাড়ছে। যদিও এই আবহাওয়া অনেকের কাছেই খুব উপভোগ্য, কিন্তু বাতের রোগীদের জন্য এটি নিয়ে আসে কঠিন সময়। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের গবেষণা থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মানুষ শারীরিক ব্যথাজনিত সমস্যায় ভোগেন, যার মধ্যে বাতের ব্যথা অন্যতম।
বাতের ব্যথার একটি প্রধান কারণ হলো ইউরিক অ্যাসিড। এটি শরীরের জয়েন্টগুলোতে জমে বাত রোগের সৃষ্টি করে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এই রোগটিকে আর্থ্রাইটিস বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে সঠিক চিকিৎসা না নিলে এটি শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষত হাড় বা মাংসপেশিতে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করতে পারে।
তবে একটি গুরুতর বিষয় হলো, অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এই ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু এভাবে ওষুধ খাওয়া কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া উপায় অনুসরণ করে দেখা যেতে পারে। ব্যথার ওষুধে যাওয়ার আগে যদি প্রাকৃতিক উপায়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী হবে।
আজ (১২ অক্টোবর) বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস। এই উপলক্ষে চলুন জেনে নিই, বাতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে ঘরে বসে অনুসরণ করার মতো কিছু কার্যকরী টিপস:
১. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: অতিরিক্ত ওজন বাতের ব্যথাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শরীরে অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা হাঁটু, নিতম্ব ও পায়ের জয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ব্যথা ও অস্বস্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। আমেরিকান কলেজ অব রিউমাটোলজি এবং আর্থ্রাইটিস ফাউন্ডেশন-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, যদি কারও বাতের সমস্যা থাকে এবং তিনি অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী হন, তবে তাকে অবশ্যই ওজন কমাতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কারও ওজন বেশি হয়, তবে তিনি মাত্র ৫ শতাংশ ওজন কমাতেও সক্ষম হন, তবে তার শরীরে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এতে কেবল উপসর্গেরই উন্নতি হয় না, বরং চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ে, ব্যথা কমে যায় এবং ভবিষ্যতে জয়েন্টে নতুন করে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
২. নিয়মিত ব্যায়াম করা: যাদের বাতের সমস্যা আছে, তাদের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম মহৌষধের মতো কাজ করে। নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি বাতের অনেক উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। এটি ওজন কমায়, শরীরের জয়েন্টগুলোকে নমনীয় রাখে এবং জয়েন্টের চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করা উচিত। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলেই উপকার পাওয়া যাবে। বাতের সমস্যায় ভোগা রোগীদের জন্য লো-ইমপ্যাক্ট এক্সারসাইজগুলো সবচেয়ে ভালো। এই ধরনের ব্যায়াম জয়েন্টে কম চাপ ফেলে শরীরকে সচল রাখে। যেমন— হাঁটা, সাইক্লিং, তাই চি এবং সাঁতার কাটা। যদি আপনি বুঝতে না পারেন কোথা থেকে শুরু করবেন, তাহলে একজন চিকিৎসক বা ফিটনেস প্রশিক্ষকের সাহায্য নিতে পারেন। তিনি আপনার শারীরিক অবস্থা, বয়স ও আর্থ্রাইটিসের মাত্রা অনুযায়ী একটি উপযুক্ত ব্যায়াম পরিকল্পনা তৈরি করে দেবেন।
৩. গরম ও ঠান্ডা পানির সেঁক দেওয়া: আর্থ্রাইটিসজনিত ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর জন্য গরম এবং ঠান্ডা পানির সেঁক অত্যন্ত কার্যকর একটি ঘরোয়া পদ্ধতি। সঠিকভাবে এটি প্রয়োগ করলে ব্যথা কমে আসে, জয়েন্ট শিথিল হয় এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গরম পানির সেঁক দিলে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে জয়েন্টের শক্তভাব বা কাঠিন্য কমে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে গরম পানিতে গোসল করলে শরীর হালকা লাগে এবং জয়েন্টের জড়তা কমে। অন্যদিকে, ঠান্ডা পানির সেঁক বাতে ব্যথার প্রদাহ, ফোলা ও তীব্র ব্যথা দ্রুত কমাতে সাহায্য করে। একটি আইস ব্যাগে বরফ ভরে ব্যথাযুক্ত স্থানে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে রাখুন। এতে দ্রুত আরাম মিলবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে— কখনোই বরফ সরাসরি ত্বকে লাগানো উচিত নয়, এতে ত্বকের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে গরম ও ঠান্ডা থেরাপি পালাক্রমে ব্যবহার করতে পারেন। এতে শরীর শিথিল হবে, ব্যথা কমবে এবং চলাফেরায় স্বস্তি ফিরে আসবে।
৪. সুস্থ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা: আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে এবং শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার খাদ্যতালিকায় তাজা ফল, সবজি ও প্রাকৃতিক খাবার রাখা আবশ্যক। কারণ এগুলো শুধু জয়েন্টের প্রদাহ কমানোর পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে আর্থ্রাইটিসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ভেগান ও মেডিটারেনিয়ান খাদ্যাভ্যাস প্রদাহ ও ব্যথা উভয়ই কমাতে সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের খাবারে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান থাকে, যা জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়াও, ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা মূলত মাছ, ফ্ল্যাক্সসিড বা আখরোটে পাওয়া যায়, এই খাবারগুলো জয়েন্টের শক্তাভাব ও ব্যথা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৫. খাবারে হলুদের ব্যবহার: রান্নাঘরের অপরিহার্য মসলা হলুদ কেবল রং ও স্বাদের জন্যই নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্যও এক অনন্য ভেষজ উপাদান। হলুদে রয়েছে ‘কারকিউমিন’ নামের একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান, যাতে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ রয়েছে। এই গুণগুলো শরীরের প্রদাহ কমিয়ে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ও ফোলা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন হলুদ ঠিক কীভাবে শরীরে কাজ করে, তবে বহু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে এটি জয়েন্টের প্রদাহ কমাতে এবং ব্যথা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ও ফোলা উপশমে প্রতিদিনের রান্নায় কাঁচা বা গুঁড়ো হলুদ ব্যবহার করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত হলুদ গ্রহণ করা উচিত নয়। অল্প পরিমাণে নিয়মিত ব্যবহার করাই যথেষ্ট উপকার দিতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























