ঢাকা ০১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে নতুন ট্রেন্ড ‘ক্রাউড ফান্ডিং’: যা বলছে আইন ও ইসি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণার খরচ মেটাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সরাসরি সাধারণ জনগণের কাছ থেকে অর্থ বা ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ সংগ্রহ করছেন। প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রার্থীরা এখন ভোটের মাঠের পাশাপাশি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনুদান চাইছেন। এই প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অল্প অল্প করে তহবিল গঠন করা হচ্ছে।

এই অভিনব উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রার্থীরা অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা অনেককে ইতিবাচকভাবে আকৃষ্ট করছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, এভাবে জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা নেওয়া নির্বাচনি আইনের পরিপন্থী কি না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্পষ্ট করেছে যে, নির্বাচনি বিধিমালায় ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে এক্ষেত্রে প্রার্থীকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

তহবিল সংগ্রহের এই দৌড়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ আলোচনায় এসেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদ্য পদত্যাগকারী নেতা ডা. তাসনিম জারা, ডা. তাজনূভা জাবীন ও দিলশানা পারুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুদানের আবেদন জানিয়ে সাড়া ফেলেছেন। তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, তিনি অসততা ও মিথ্যার রাজনীতি পরিহার করতে চান এবং নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকতে চান।

একইভাবে আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমান এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত থাকা প্রয়াত ওসমান হাদিও ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ সহায়তা চেয়েছিলেন। এছাড়া ঢাকা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও প্রয়োজনীয় খরচের জন্য জনগণের দ্বারস্থ হয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক মতভেদে কেউ কেউ পরবর্তীতে দল থেকে পদত্যাগ করে সংগৃহীত টাকা ফেরত দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। প্রার্থীদের মূল দাবি হলো, কালো টাকার প্রভাবমুক্ত হয়ে সৎ রাজনীতির চর্চা করতে জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

আইনি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০চ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীরা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান নিতে পারেন। তবে এখানে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে; একজন ব্যক্তির কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ এবং কোনো কোম্পানির কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা নেওয়া সম্ভব।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, ২০ হাজার টাকার বেশি যেকোনো অনুদান অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হতে হবে যাতে এর সঠিক হিসাব থাকে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উন্নত দেশগুলোতেও এ ধরনের তহবিলের প্রচলন রয়েছে এবং আমাদের দেশেও এতে কোনো আইনি বাধা নেই। তবে হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে বা নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করলে নির্বাচন কমিশন যেকোনো সময় প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একজন প্রার্থী তার নির্বাচনি এলাকায় ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। এই নতুন ধারার অর্থায়ন দেশের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ফেরাতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে নতুন ট্রেন্ড ‘ক্রাউড ফান্ডিং’: যা বলছে আইন ও ইসি

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণার খরচ মেটাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সরাসরি সাধারণ জনগণের কাছ থেকে অর্থ বা ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ সংগ্রহ করছেন। প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রার্থীরা এখন ভোটের মাঠের পাশাপাশি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনুদান চাইছেন। এই প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অল্প অল্প করে তহবিল গঠন করা হচ্ছে।

এই অভিনব উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রার্থীরা অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা অনেককে ইতিবাচকভাবে আকৃষ্ট করছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, এভাবে জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা নেওয়া নির্বাচনি আইনের পরিপন্থী কি না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্পষ্ট করেছে যে, নির্বাচনি বিধিমালায় ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে এক্ষেত্রে প্রার্থীকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

তহবিল সংগ্রহের এই দৌড়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ আলোচনায় এসেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদ্য পদত্যাগকারী নেতা ডা. তাসনিম জারা, ডা. তাজনূভা জাবীন ও দিলশানা পারুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুদানের আবেদন জানিয়ে সাড়া ফেলেছেন। তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, তিনি অসততা ও মিথ্যার রাজনীতি পরিহার করতে চান এবং নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকতে চান।

একইভাবে আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমান এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত থাকা প্রয়াত ওসমান হাদিও ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ সহায়তা চেয়েছিলেন। এছাড়া ঢাকা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও প্রয়োজনীয় খরচের জন্য জনগণের দ্বারস্থ হয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক মতভেদে কেউ কেউ পরবর্তীতে দল থেকে পদত্যাগ করে সংগৃহীত টাকা ফেরত দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। প্রার্থীদের মূল দাবি হলো, কালো টাকার প্রভাবমুক্ত হয়ে সৎ রাজনীতির চর্চা করতে জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

আইনি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০চ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীরা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান নিতে পারেন। তবে এখানে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে; একজন ব্যক্তির কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ এবং কোনো কোম্পানির কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা নেওয়া সম্ভব।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, ২০ হাজার টাকার বেশি যেকোনো অনুদান অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হতে হবে যাতে এর সঠিক হিসাব থাকে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উন্নত দেশগুলোতেও এ ধরনের তহবিলের প্রচলন রয়েছে এবং আমাদের দেশেও এতে কোনো আইনি বাধা নেই। তবে হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে বা নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করলে নির্বাচন কমিশন যেকোনো সময় প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একজন প্রার্থী তার নির্বাচনি এলাকায় ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। এই নতুন ধারার অর্থায়ন দেশের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ফেরাতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।