ঢাকা ০১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

জামায়াত জোট ঘিরে এনসিপিতে ভাঙন, তারুণ্যের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভাঙনের মুখে পড়ায় তারুণ্যের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে কি না—এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণ নেতৃত্বের প্রতি যে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তে দলটি একদিকে মধ্যপন্থি অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগে পড়ছে।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় আপত্তি জানিয়ে ইতোমধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ ৩০ নেতা চিঠি দিয়েছেন। বিপরীতে, জোটের পক্ষে পালটা চিঠি দিয়েছেন প্রায় ১৭০ জন নেতা। রোববার বিকেল পর্যন্ত ১২২ জনের বেশি নেতা পৃথকভাবে মতামত জানানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনূভা জাবীনসহ একাধিক শীর্ষ নেতার পদত্যাগে দলে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হলে আরও পদত্যাগের আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতৃত্ব পর্যায়ে এ ধরনের ভাঙন এনসিপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে তুলতে পারে। এর ফলে গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পথ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এনসিপির আদর্শের সঙ্গে জামায়াতের জোট সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি বলেন, জোট গঠন রাজনৈতিক অধিকার হলেও ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে এনসিপির বর্তমান সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. নুর উদ্দিন মনে করেন, এনসিপির সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, হঠাৎ উত্থান হওয়া এই দলটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দর্শন দাঁড় করাতে পারেনি। অন্যদিকে একই বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জোট সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে নেওয়া হলে এমন সংকট এড়ানো যেত।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা এনসিপিতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অনেক পরিচিত মুখ যুক্ত হওয়ায় জনমনে আশা তৈরি হয়েছিল। তবে আট মাস না যেতেই দলটি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। শুরু থেকেই এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। একসময় জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলেও দলটির নেতাদের বক্তব্য শোনা গেছে। পরে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট চূড়ান্ত করা হয়, যা ভাঙনের সূত্রপাত ঘটায়।

জোটবিরোধী অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন এনসিপির একাধিক নেতা। সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন লিখেছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, জামায়াত নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র নয় এবং এ ধরনের সমঝোতা দলটির আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। একই অবস্থান নিয়ে ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আবুল কাশেম, নওগাঁ-৫ আসনের প্রার্থী মনিরা শারমিন ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. তাসনূভা জাবীন নির্বাচন ও দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুমও দলীয় কার্যক্রম থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর মতে, জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এনসিপির নেতৃত্ব মূল দর্শন থেকে সরে এসেছে। এর আগে কট্টর জামায়াতবিরোধী হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হকও দল ছাড়েন।

এনসিপির বাইরে থেকেও সমালোচনা এসেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, এনসিপির নেতারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারায় বেশি মনোযোগী। তাঁর মতে, জোট রাজনীতি গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে তৈরি ঐক্যে আরও বিভক্তি সৃষ্টি করবে।

রোববার জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জানান, ৮ দলীয় জোটে এলডিপি ও এনসিপি যুক্ত হয়েছে। একই দিন সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম স্পষ্ট করে জানান, তিনি এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন না। তাঁর মতে, জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন দাবি করেছেন, কয়েকজন নেতার পদত্যাগে দলের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তাঁর ভাষায়, সবকিছু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই হচ্ছে এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তি অটুট থাকবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

জামায়াত জোট ঘিরে এনসিপিতে ভাঙন, তারুণ্যের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা

আপডেট সময় : ০১:৪৫:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভাঙনের মুখে পড়ায় তারুণ্যের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে কি না—এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণ নেতৃত্বের প্রতি যে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তে দলটি একদিকে মধ্যপন্থি অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগে পড়ছে।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় আপত্তি জানিয়ে ইতোমধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ ৩০ নেতা চিঠি দিয়েছেন। বিপরীতে, জোটের পক্ষে পালটা চিঠি দিয়েছেন প্রায় ১৭০ জন নেতা। রোববার বিকেল পর্যন্ত ১২২ জনের বেশি নেতা পৃথকভাবে মতামত জানানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যেই সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনূভা জাবীনসহ একাধিক শীর্ষ নেতার পদত্যাগে দলে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হলে আরও পদত্যাগের আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতৃত্ব পর্যায়ে এ ধরনের ভাঙন এনসিপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে তুলতে পারে। এর ফলে গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পথ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এনসিপির আদর্শের সঙ্গে জামায়াতের জোট সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি বলেন, জোট গঠন রাজনৈতিক অধিকার হলেও ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে এনসিপির বর্তমান সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. নুর উদ্দিন মনে করেন, এনসিপির সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, হঠাৎ উত্থান হওয়া এই দলটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দর্শন দাঁড় করাতে পারেনি। অন্যদিকে একই বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জোট সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে নেওয়া হলে এমন সংকট এড়ানো যেত।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা এনসিপিতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অনেক পরিচিত মুখ যুক্ত হওয়ায় জনমনে আশা তৈরি হয়েছিল। তবে আট মাস না যেতেই দলটি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। শুরু থেকেই এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। একসময় জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলেও দলটির নেতাদের বক্তব্য শোনা গেছে। পরে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট চূড়ান্ত করা হয়, যা ভাঙনের সূত্রপাত ঘটায়।

জোটবিরোধী অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন এনসিপির একাধিক নেতা। সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন লিখেছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, জামায়াত নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র নয় এবং এ ধরনের সমঝোতা দলটির আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। একই অবস্থান নিয়ে ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আবুল কাশেম, নওগাঁ-৫ আসনের প্রার্থী মনিরা শারমিন ও ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. তাসনূভা জাবীন নির্বাচন ও দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুমও দলীয় কার্যক্রম থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর মতে, জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এনসিপির নেতৃত্ব মূল দর্শন থেকে সরে এসেছে। এর আগে কট্টর জামায়াতবিরোধী হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হকও দল ছাড়েন।

এনসিপির বাইরে থেকেও সমালোচনা এসেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, এনসিপির নেতারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারায় বেশি মনোযোগী। তাঁর মতে, জোট রাজনীতি গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে তৈরি ঐক্যে আরও বিভক্তি সৃষ্টি করবে।

রোববার জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জানান, ৮ দলীয় জোটে এলডিপি ও এনসিপি যুক্ত হয়েছে। একই দিন সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম স্পষ্ট করে জানান, তিনি এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন না। তাঁর মতে, জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন দাবি করেছেন, কয়েকজন নেতার পদত্যাগে দলের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তাঁর ভাষায়, সবকিছু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই হচ্ছে এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তি অটুট থাকবে।