বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’ বলে কিছু নেই, এই পুরোনো সত্যটি আবারও নতুন করে সামনে এলো এক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন অনেককেই বিস্মিত করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের পাশে বসে নতুন নির্বাচনি জোটের ঘোষণা দেওয়ার দৃশ্য রাজনীতির বিশ্লেষকদের সামনে নতুন সমীকরণ হাজির করেছে।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনটি বিএনপির নীতিনির্ধারকদের জন্যও স্বস্তিকর ছিল না। একসময় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত অলি আহমদ, যিনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলকে সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, আজ সেই দলের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে অবস্থান করছেন।
শুধু বাইরে থাকাই নয়, তিনি যুক্ত হয়েছেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নতুন আট দলীয় জোটে। কেন এই বিচ্ছেদ—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। এটি কি কেবল আসন বণ্টনের দ্বন্দ্ব, নাকি দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন ও যোগাযোগহীনতার ফল, এই প্রশ্নই এখন মুখ্য।
অলি আহমদের রাজনৈতিক পথচলা এবং বিএনপির ইতিহাস বহুদিন ধরেই পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নিরাপদ চাকরি ও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা এবং ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে যমুনা সেতু প্রকল্পের সূচনা তার রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
তবু ২০০৬ সালে তিনি বিএনপি থেকে বেরিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। এরপরও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, পুরোনো ক্ষত ও নতুন অভিমান মিলেই এই সম্পর্ককে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে দূরত্বের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে যোগাযোগের অভাব ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের সংকট। যদিও সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে অলি আহমদ সরাসরি কিছু বলেননি, তার আগের বক্তব্যগুলো থেকেই অসন্তোষের চিত্র স্পষ্ট। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, গত আড়াই বছরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমনকি তার পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে তিনি নিজেকে দলটির কাছে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল আসন ভাগাভাগির বিরোধ নয়; বরং সম্মান ও স্বীকৃতির প্রশ্ন। একজন প্রবীণ রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিএনপির কাছ থেকে যে ন্যূনতম সৌজন্য প্রত্যাশা করেছিলেন, তা না পাওয়াই তাকে নতুন পথে ঠেলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছিল, এলডিপির পক্ষ থেকে বিএনপির কাছে সম্মানজনক সংখ্যক আসন দাবি করা হয়েছিল। সূত্রমতে, অন্তত ছয়টি আসনের প্রত্যাশা ছিল অলি আহমদের। কিন্তু সেই দাবির কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের বিএনপিতে যোগদান এবং কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়ন পাওয়া অলি আহমদের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। তিনি এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছেন এবং এতে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে তার সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে বিএনপির কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, কর্নেল অলি আহমদ শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি বিএনপির ইতিহাসের অংশ। তাকে ধরে রাখতে না পারা জোট রাজনীতিতে বিএনপির দুর্বলতারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জন্য এটি বড় রাজনৈতিক অর্জন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের ভার কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়তে অলি আহমদের মতো একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে পাওয়া জামায়াতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
অন্যদিকে বিএনপির ভেতর থেকে ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, রাজনীতির বাস্তবতায় সব দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তৃণমূলের মনোভাব ও দলের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকেই। তাদের মতে, যোগাযোগের বিষয়টি একতরফা নয় এবং অলি আহমদের উচ্চাভিলাষ ও সাম্প্রতিক অবস্থান বিএনপিকেও বিস্মিত করেছে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পাশে অলি আহমদের উপস্থিতি নতুন জোটের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রাধান্য থাকা এই জোটে এলডিপি ও জাগপার মতো দল যুক্ত হয়ে একটি মিশ্র রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। জানা গেছে, এই জোটে অলি আহমদকে ছয়টি আসন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা বিএনপির কাছ থেকে তিনি পাননি।
সব মিলিয়ে, কর্নেল অলি আহমদের জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদান কেবল একটি দলবদল নয়; এটি বাংলাদেশের জোট রাজনীতির ভঙ্গুর বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে ইতিহাস, আবেগ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, প্রাধান্য পাচ্ছে স্বার্থ, সম্মান ও ক্ষমতার হিসাব। যিনি একসময় জিয়ার বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন এবং যমুনা সেতু প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন, তিনি আজ জিয়ার গড়া দলের বিপরীত মেরুতে। এই রাজনৈতিক দূরত্বের দায় কার, তা নিয়ে বিতর্ক চললেও আপাতত স্পষ্ট, এই পরিবর্তনের সুযোগটি জামায়াতে ইসলামী দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। নির্বাচনের মাঠে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রিপোর্টারের নাম 

























