গত বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এর গভীর রাতে একজোট অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি রাজধানীর ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন আক্রমণ করে ছয়তলা ভবনের প্রায় প্রতিটি কক্ষের বিপুল ক্ষতিসাধন করে, লুটপাট চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। ঘটনার পরেই পুলিশবাহিনী ও সেনাবাহিনী উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং তাদের সদস্যরা আগুন নিভিয়ে ফেলে। সে সময় র্যাবও ভবন চত্বরে উপস্থিত ছিল।
পরদিন শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সংস্কৃতি উপদেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আসেন এবং ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ছায়ানট সংগঠকদের অবহিত করেন যে, ভবনের নিরাপত্তা প্রদানের ভার এবং অবকাঠামোগত সকল ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার আগ্রহী। পরের দিন শনিবার ছায়ানট সার্বিক ধ্বংসাত্মক ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণসহ ছায়ানট ধানমণ্ডি থানায় মামলা রুজু করে। ছায়ানট যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত দোষীদের শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে।
ওসমান হাদির মর্মান্তিক মৃত্যুজনিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনও মহল এই হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা চলছে। তবে এই নবীন নেতার মৃত্যুর সূত্রে সংস্কৃতি-ভবনে আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে ছায়ানট মনে করে না। বরং, বাঙালি সংস্কৃতি-বিরোধী ব্যক্তিরা পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছে বলেই ধারণা ছায়ানটের। এর মধ্যে ওসমান হাদির জানাজা ও দাফন যথাযোগ্য মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দিনের নানা সময়ে পুলিশবাহিনী এবং র্যাব ও বিজিবি ভবনের নিরাপত্তা বিধানে উপস্থিত থাকছে।
জন্মাবধি ছায়ানট রাজনীতি বা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। ছায়ানট বিগত ষাট বছর ধরে সঙ্গীত-সংস্কৃতির অনুশীলন এবং তার প্রসারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তাকে জাগ্রত করা ও সর্বজনের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে একটি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সমাজ গড়ে তোলা ও বজায় রাখার কাজে সচেষ্ট রয়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতি- সমন্বিত সাধারণ শিক্ষার লক্ষ্যে দুই দশক ধরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছে।
ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে হামলা চালানোর রাতেই শীর্ষস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে সমাদৃত সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা ভবনে অগ্নিসংযোগ করে একটি মহল। এমন ধ্বংসাত্মক কাজ স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করারই সমার্থক বলে মনে করে ছায়ানট। এমন কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
১৯ ডিসেম্বর শনিবার রাতে আগুন লাগিয়ে উদীচী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কার্যালয় ভস্মীভূত করারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে ছায়ানট।
এমন পরিস্থিতিতেও অনতিবিলম্বে স্বাভাবিক এবং নিয়মিত কাজে ফিরে যেতে উন্মুখ ছায়ানট। এমনটাই জানান ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী। আরও জানান, তবে ক্ষতিগ্রস্ত জরুরি প্রয়োজনের সামগ্রী মেরামত ও সংগ্রহ করার আগে সে কাজ খুবই দুরূহ। এর মধ্যেও ছায়ানট তার নির্ধারিত অনুষ্ঠান আয়োজনে সক্ষম হবে বলে আমরা আশাবাদী।
এদিকে সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা জানান, ছায়ানট ভবন আক্রান্ত হওয়ায় দেশ ও বিদেশের প্রাক্তনী ও শিক্ষার্থীসহ বিপুল সংখ্যক শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বার্তা পেয়ে তারা অভিভূত। অনেকে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে লাইসা আহমদ লিসার বরাতে ছায়ানট সবিনয়ে জানাতে চায় যে, এটি স্বনির্ভর স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, একান্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো খাত ছাড়া নিয়মিত কার্যক্রমের জন্য আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে অভ্যস্ত নয় ছায়ানট। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজস্ব বৃহত্তর পরিবারের সংগঠক, প্রাক্তনী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে ছায়ানট এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। সমাজ ও সংস্কৃতির এই সংকটকালে সর্বজনের পরামর্শ ও সকল মহলের সংহতি একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করে ছায়ানট।
ছায়ানট পুনর্ব্যক্ত করছে যে, সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি চর্চা এবং সংগীত সাধনা ও প্রসারে তার স্থির প্রত্যয়ে যাত্রায় অবিচল থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 

























