ঢাকা ০৪:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: দেশের আইনশৃঙ্খলা কী ইঙ্গিত দেয়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব‍্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে তেমনই নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য প্রার্থীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে সে নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠক। তারা বলছে, হাদির ওপর সশস্ত্র হামলা গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।

এদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাদির ওপর এমন গুলিবর্ষণ ও তার আহত হওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপযোগী হতো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো আগে থেকেই (তফসিলের আগে) সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে এ ধরনের বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কমে যেতো। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, একটা ঘটনা ঘটেছে, কী কারণে ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে সেটা যতক্ষণ না পর্যন্ত তদন্ত করে বের করা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি না যে নির্বাচনের কারণেই ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়েছে। এদিন দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোডে তাকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

হিউম‍্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ‘হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন রিপোর্ট ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৮৫২টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৭৪টি ঘটেছে বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৪ হাজার ৫৭৭ জন আহত এবং ৮০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘটিত ১৪১টি সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত এবং ৭৩৬ জন আহত হন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষে দুই জন নিহত এবং ৫০৩ জন আহত হয়েছেন। অবশিষ্ট হতাহতের ঘটনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সংঘর্ষে ঘটেছে। এছাড়া প্রতিবেদনে মব সহিংসতার ২৭৬টি ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত এবং ২৪২ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড় হিসেবে প্রতি মাসে প্রায় ১৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

দিনে-দুপুরে চলন্ত রিকশায় হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় অন্য প্রার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা শঙ্কা। তাদের মতে, হাদিকে দুর্বৃত্তদের গুলির ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনার পর পর সদ‍্য পদত‍্যাগ করা উপদেষ্টা ও ঢাকা-১০ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফ মোহাম্মদ সজীব ভূঁইয়া এক র‍্যালিতে ‘হাদির ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এনসিপি বলেছে, এ হামলা শুধু একজন প্রার্থীর ওপর নয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত।

ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল বলেছেন, হাদিকে গুলি করার পর প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দিনদুপুরে এভাবে একজনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিগত দেড় বছরে প্রকাশ্যে কয়েকটি খুন ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আমরা সতর্ক নীরবতা দেখছি।

ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামেও একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকে গুলি করা হয়েছে। এসব অশুভ ইঙ্গিত। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন অপরাধ দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই প্রার্থীর ওপর এমন হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলে মনে করছেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাবি অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, হাদির ওপর এমন গুলিবর্ষণ ও তার আহত হওয়া ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপযোগী হতো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো আগে থেকেই (তফসিলের আগে) সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে এ ধরনের বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কমে যেত।

তিনি বলেন, এটি (হাদি ওপর গুলি) ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একমাত্র ঘটনা নয়। এর আগেও চট্টগ্রামে ও অন্য কয়েকটি স্থানে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনাগুলোর বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে বিলম্ব, যারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বা পারছেন, তারা অভিযুক্ত হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা দৃশ্যমান আইনগত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গগুলো মানুষকে প্রভাবিত করছে। নির্বাচনের জন্য প্রত্যাশিত আইনশৃঙ্খলা থাকা প্রয়োজন, সেই বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, সেই প্রশ্নের সূত্র ধরে এবারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা আমরা বলছি; যেমন অবৈধ অস্ত্র, অপরাধীদের সক্রিয়তা, নানাভাবে সংঘাত-সহিংসতায় অপরাধীদের জড়ানোর বিষয়টি  একটি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে অশনি সংকেত।

অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আজকের ঘটনা (হাদির ওপর হামলা) একজন প্রার্থীর বা হাদির ওপর আক্রমণ হয়েছে, এমন না দেখে বরং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ হয়েছে, এমনভাবে দেখা উচিত। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হলে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করবে, প্রভাবিত করবে।

এদিকে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। শুক্রবার বিকালে তিনি বলেন, ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আনা হবে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা, র‌্যাবসহ সবাই দুর্বৃত্তদের ধরতে কাজ করছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত আছে। প্রয়োজনে আরও বাড়ানো হবে। দুয়েকটি ঘটনা ঘটছে। তবে দ্রুতই এসব ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে বিশেষ অভিযান চালানোর কথাও জানান তিনি।

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ঘটনার পরপরই র‍্যাব-৩, সদর দফতরের গোয়েন্দা ইউনিটসহ সব টিম গুলি করা দুইজনকে আটকের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আপনারা আসলে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন এটা নিয়ে কোনও মন্তব্য করা যাবে না। কেন মন্তব্য করা যাবে না… যে একটা ঘটনা ঘটেছে কী কারণে ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে, সেটা যতক্ষণ না পর্যন্ত তদন্ত করে বের করা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি না যে নির্বাচনের কারণেই ঘটনা ঘটেছে। যা হোক যে ঘটনাই ঘটছে, সেটা নিন্দনীয়। আমরা মনে করি সরকার সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করবে এবং আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি লক্ষণীয় কিনা জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন- না, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় কিন্তু এটা এরকম কিছু মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। অবশ্যই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি অবশ্যই লাগবে।  নিশ্চয়ই সরকার সে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যে নির্বাচন কমিশন বা সরকার মনে করবে অবনতি ঘটেছে, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে, এটা আমরা এখনও মনে করি না।

তার মানে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক কিনা জানতে চাইলে রহমানেল মাসউদ বলেন, স্বাভাবিক তো অবশ্যই বলবো। একটা ঘটনা ঘটতেই পারে; তবে এটা তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে যারা দোষী সাব‍্যস্ত হবে তাদের যেন যথাযথ শাস্তি হয় আমরা সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শেষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: গভীর সংকটের মুখে কূটনৈতিক তৎপরতা

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: দেশের আইনশৃঙ্খলা কী ইঙ্গিত দেয়

আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব‍্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে তেমনই নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য প্রার্থীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে সে নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠক। তারা বলছে, হাদির ওপর সশস্ত্র হামলা গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।

এদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাদির ওপর এমন গুলিবর্ষণ ও তার আহত হওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপযোগী হতো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো আগে থেকেই (তফসিলের আগে) সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে এ ধরনের বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কমে যেতো। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, একটা ঘটনা ঘটেছে, কী কারণে ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে সেটা যতক্ষণ না পর্যন্ত তদন্ত করে বের করা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি না যে নির্বাচনের কারণেই ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়েছে। এদিন দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোডে তাকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

হিউম‍্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ‘হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন রিপোর্ট ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৮৫২টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৭৪টি ঘটেছে বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৪ হাজার ৫৭৭ জন আহত এবং ৮০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘটিত ১৪১টি সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত এবং ৭৩৬ জন আহত হন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষে দুই জন নিহত এবং ৫০৩ জন আহত হয়েছেন। অবশিষ্ট হতাহতের ঘটনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সংঘর্ষে ঘটেছে। এছাড়া প্রতিবেদনে মব সহিংসতার ২৭৬টি ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত এবং ২৪২ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড় হিসেবে প্রতি মাসে প্রায় ১৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

দিনে-দুপুরে চলন্ত রিকশায় হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় অন্য প্রার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা শঙ্কা। তাদের মতে, হাদিকে দুর্বৃত্তদের গুলির ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট হয়েছে। ঘটনার পর পর সদ‍্য পদত‍্যাগ করা উপদেষ্টা ও ঢাকা-১০ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফ মোহাম্মদ সজীব ভূঁইয়া এক র‍্যালিতে ‘হাদির ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এনসিপি বলেছে, এ হামলা শুধু একজন প্রার্থীর ওপর নয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত।

ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল বলেছেন, হাদিকে গুলি করার পর প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দিনদুপুরে এভাবে একজনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিগত দেড় বছরে প্রকাশ্যে কয়েকটি খুন ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আমরা সতর্ক নীরবতা দেখছি।

ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামেও একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকে গুলি করা হয়েছে। এসব অশুভ ইঙ্গিত। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন অপরাধ দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই প্রার্থীর ওপর এমন হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলে মনে করছেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাবি অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, হাদির ওপর এমন গুলিবর্ষণ ও তার আহত হওয়া ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপযোগী হতো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো আগে থেকেই (তফসিলের আগে) সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে এ ধরনের বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কমে যেত।

তিনি বলেন, এটি (হাদি ওপর গুলি) ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একমাত্র ঘটনা নয়। এর আগেও চট্টগ্রামে ও অন্য কয়েকটি স্থানে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনাগুলোর বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে বিলম্ব, যারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বা পারছেন, তারা অভিযুক্ত হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা দৃশ্যমান আইনগত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গগুলো মানুষকে প্রভাবিত করছে। নির্বাচনের জন্য প্রত্যাশিত আইনশৃঙ্খলা থাকা প্রয়োজন, সেই বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, সেই প্রশ্নের সূত্র ধরে এবারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা আমরা বলছি; যেমন অবৈধ অস্ত্র, অপরাধীদের সক্রিয়তা, নানাভাবে সংঘাত-সহিংসতায় অপরাধীদের জড়ানোর বিষয়টি  একটি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে অশনি সংকেত।

অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আজকের ঘটনা (হাদির ওপর হামলা) একজন প্রার্থীর বা হাদির ওপর আক্রমণ হয়েছে, এমন না দেখে বরং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ হয়েছে, এমনভাবে দেখা উচিত। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হলে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করবে, প্রভাবিত করবে।

এদিকে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। শুক্রবার বিকালে তিনি বলেন, ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আনা হবে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা, র‌্যাবসহ সবাই দুর্বৃত্তদের ধরতে কাজ করছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত আছে। প্রয়োজনে আরও বাড়ানো হবে। দুয়েকটি ঘটনা ঘটছে। তবে দ্রুতই এসব ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে বিশেষ অভিযান চালানোর কথাও জানান তিনি।

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ঘটনার পরপরই র‍্যাব-৩, সদর দফতরের গোয়েন্দা ইউনিটসহ সব টিম গুলি করা দুইজনকে আটকের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আপনারা আসলে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন এটা নিয়ে কোনও মন্তব্য করা যাবে না। কেন মন্তব্য করা যাবে না… যে একটা ঘটনা ঘটেছে কী কারণে ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে, সেটা যতক্ষণ না পর্যন্ত তদন্ত করে বের করা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি না যে নির্বাচনের কারণেই ঘটনা ঘটেছে। যা হোক যে ঘটনাই ঘটছে, সেটা নিন্দনীয়। আমরা মনে করি সরকার সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করবে এবং আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি লক্ষণীয় কিনা জানতে চাইলে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন- না, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় কিন্তু এটা এরকম কিছু মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করবে। অবশ্যই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি অবশ্যই লাগবে।  নিশ্চয়ই সরকার সে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যে নির্বাচন কমিশন বা সরকার মনে করবে অবনতি ঘটেছে, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে, এটা আমরা এখনও মনে করি না।

তার মানে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক কিনা জানতে চাইলে রহমানেল মাসউদ বলেন, স্বাভাবিক তো অবশ্যই বলবো। একটা ঘটনা ঘটতেই পারে; তবে এটা তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে যারা দোষী সাব‍্যস্ত হবে তাদের যেন যথাযথ শাস্তি হয় আমরা সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।