সৌদি আরবের রিয়াদে কারখানায় কর্মস্থলেই ঘুমের মধ্যে আগুনে পুড়ে ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের অকালমৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও আবাসন নিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্রকে উন্মোচিত করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবাসীরা পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনের পথ বা উন্নত বাসস্থান সুবিধা ছাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস ও কাজ করতে বাধ্য হন। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ কফিনে চেপে দেশে ফিরলেও, এসব আকস্মিক প্রাণহানি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অভাব স্পষ্ট।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখলেও, তাঁদের বিপদে বা অকালমৃত্যুতে রাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে সময়োপযোগী সহায়তা মেলা কঠিন হয়ে পড়ে। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শোকবার্তা এবং আশ্বাস দেওয়া হলেও, আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর শ্রম উইংয়ের উদাসীনতার কারণে নিহতের পরিবারগুলো বেশিরভাগ সময়ই ন্যায্য ক্ষতিপূরণ বা বীমার টাকা থেকে বঞ্চিত হয়। আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে বছরের পর বছর ধরে স্বজনহারা পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘোরঘুরি করতে হয়।
এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি নিরসন ও প্রবাসী শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে অনতিবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
- চুক্তিতে কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত: কর্মী নিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত আবাসন এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও নিয়োগপত্রে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
- দূতাবাসের শ্রম উইং শক্তিশালীকরণ: অভিবাসী অধ্যুষিত দেশগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংকে অর্থনৈতিক ও আইনিভাবে ক্ষমতায়ন করা, যাতে তারা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে নিহতদের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে।
- ক্ষতিপূরণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ: মৃত প্রবাসীর পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ ডিজিটাল ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করা।
- আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আদায়: রিয়াদের অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেন কারখানার মালিকদের বিচারের আওতায় আনে এবং শ্রমিকদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণে বাধ্য করে, সে লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা।
রিয়াদের ছাই হয়ে যাওয়া কারখানার আগুন নিভলেও আত্রাই ও নলডাঙ্গার ১৬টি পরিবারে যে স্বজন হারানোর আগুন জ্বলছে, তা নেভাতে হলে প্রবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের মৌখিক দরদ নয়, বরং দৃশ্যমান আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সঠিক দায়িত্ব।
রিপোর্টারের নাম 

























