ঢাকা ১২:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কানেক্টিভিটি: এশীয় শতাব্দীর নতুন হিসাব

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসছে। এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিপুল জনসংখ্যা উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি নয়। বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে তার সংযোগের ওপর। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এই সংযোগকেই এখন বলা হচ্ছে ‘কানেক্টিভিটি’। যে দেশ নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই এগিয়ে গেছে। দক্ষ অবকাঠামো ও আধুনিক বন্দর এই কাজে সাহায্য করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব, অর্থাৎ এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে কানেক্টিভিটি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ। ফলে কানেক্টিভিটি এখন আর শুধু রাস্তা বা সেতু নির্মাণের বিষয় নয়, এটি মূলত একটি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (CMBEC) আমাদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এটি কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সড়ক বা রেল যোগাযোগের প্রকল্প নয়। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বাংলাদেশের তিন দিকজুড়ে ভারতের সীমান্ত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই অবস্থান বাংলাদেশকে প্রাকৃতিকভাবেই দুই অঞ্চলের সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই ভৌগোলিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। প্রস্তাবিত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোর সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙার একটি বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বা কার্যকর কোনো যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এই করিডোর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার অবসানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এই সংযোগব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। সড়ক ও রেলপথে আমরা সরাসরি চীন ও মিয়ানমারের বাজারে প্রবেশাধিকার পাব। কিন্তু শুধু রাস্তা বা বন্দর বানালেই এই বিশাল সুযোগ লুফে নেওয়া যাবে না। এর জন্য আমাদের নিজেদের ঘরের কাজও করতে হবে, যা এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টরের রাজত্ব এবং বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কানেক্টিভিটি: এশীয় শতাব্দীর নতুন হিসাব

আপডেট সময় : ১০:১১:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসছে। এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিপুল জনসংখ্যা উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি নয়। বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে তার সংযোগের ওপর। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এই সংযোগকেই এখন বলা হচ্ছে ‘কানেক্টিভিটি’। যে দেশ নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই এগিয়ে গেছে। দক্ষ অবকাঠামো ও আধুনিক বন্দর এই কাজে সাহায্য করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব, অর্থাৎ এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে কানেক্টিভিটি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ। ফলে কানেক্টিভিটি এখন আর শুধু রাস্তা বা সেতু নির্মাণের বিষয় নয়, এটি মূলত একটি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (CMBEC) আমাদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এটি কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সড়ক বা রেল যোগাযোগের প্রকল্প নয়। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বাংলাদেশের তিন দিকজুড়ে ভারতের সীমান্ত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই অবস্থান বাংলাদেশকে প্রাকৃতিকভাবেই দুই অঞ্চলের সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই ভৌগোলিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। প্রস্তাবিত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোর সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙার একটি বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বা কার্যকর কোনো যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এই করিডোর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার অবসানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এই সংযোগব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। সড়ক ও রেলপথে আমরা সরাসরি চীন ও মিয়ানমারের বাজারে প্রবেশাধিকার পাব। কিন্তু শুধু রাস্তা বা বন্দর বানালেই এই বিশাল সুযোগ লুফে নেওয়া যাবে না। এর জন্য আমাদের নিজেদের ঘরের কাজও করতে হবে, যা এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।